জীবন ও মৃত্যুর দর্শন: ভয় নয়, গ্রহণই মুক্তি
মানুষ মূলত দুই সত্তার সমন্বয়—শরীর ও আত্মা। শরীরে আঘাত লাগলে যেমন আত্মা কষ্ট পায়, তেমনি আত্মা আহত হলে শরীরও সুস্থ থাকে না। একে অপরের পরিপূরক এই দুই সত্তাই মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। শরীর হচ্ছে লৌকিক জগতের বাহন, আর আত্মা—অলৌকিক অস্তিত্বের ধারক।
আমরা জানি, মানুষের মৃত্যু হলে শরীর পচনশীল হয়ে যায়, কিন্তু আত্মা ধ্বংস হয় না। বহু ধর্ম ও দর্শনের মতে, আত্মা পরমাত্মার সান্নিধ্যে ফিরে যায়। এমন বিশ্বাসও রয়েছে—মৃত্যুর পর মানুষ আরেকটি অস্তিত্বে প্রবেশ করে, যেখানে তারা পূর্বপুরুষ ও প্রয়াত আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হয়। এই পৃথিবীতে যেমন মানুষ সামাজিক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ, তেমনি মৃত্যুর পরও সেই সম্পর্কের পুনর্মিলন ঘটে—এমন ধারণাও বহু সংস্কৃতিতে প্রচলিত।
এই বিশ্বাস থেকে বলা যায়, মৃত্যু কেবল বিচ্ছেদ নয়, বরং এক জগত থেকে আরেক জগতে স্থানান্তর। তাই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভয় বা শোকের প্রয়োজন নেই। মৃত্যুপথযাত্রীর জন্যও এটি আতঙ্কের বিষয় নাও হতে পারে। বাস্তব জীবনে এমন উদাহরণ দেখা যায়—মৃত্যুশয্যায় থেকেও অনেকে নির্ভীক থাকেন। আমার বাবাও ছিলেন তেমনই। অসুস্থ শরীর, সামনে মৃত্যু—তবু ভয়হীন কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, “ওখানে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, আমার নবী (সা.) আছেন—ভয়ের কী আছে?”
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুনিয়ায় ভালো কাজ না করে গেলে পরকালে শান্তি পাওয়া যায়, এমন নিশ্চয়তা কোনো ধর্মই দেয় না। সব ধর্মেই বলা হয়েছে, সৎকর্মই মানুষের প্রকৃত পাথেয়। যারা সত্যিকারের মানুষ হয়ে জীবন যাপন করেন, তারাই পরকালে শান্তিতে থাকবেন। এই বিশ্বাস হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে মৃত্যু ভয় নয়, বরং স্বাভাবিক নিয়তি হয়ে ওঠে।
দুনিয়ায় যেমন মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান আছে, তেমনি কবরে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ আপনজনদের উপস্থিতি—এই ভাবনাও মৃত্যুকে সহজ করে তোলে। এক জগত থেকে আরেক জগতে যাওয়ার যাত্রাটা কষ্টকর হতে পারে—যেমন স্টেশন বদল, নতুন বাহনে ওঠা—তবু তা অনিবার্য। তাই প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
ইসলামে ‘মওত’ শব্দটির অর্থ মৃত্যু হলেও ‘ইন্তেকাল’ শব্দটি বেশি ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ স্থানান্তর। অর্থাৎ মৃত্যু শেষ নয়, বরং নতুন এক যাত্রার শুরু। এরপর কিয়ামত, বিচার—সবই সত্য। সৎ জীবন যাপন করলে সেই বিচারও পার হওয়া সম্ভব—এটাই বিশ্বাস।
কবিতা: মৃত্যু
মৃত্যু সবাইকে ভাবায় কম-বেশি
আমিও ভাবি, তবে ভয় পাই না বেশি।
জীবনকে গ্রহণ করেছি বলেই
মৃত্যু অবধারিত, সুন্দর নিয়তি।
মৃত্যু আছে বলেই জীবনের স্বাদ গভীর,
জন্মের আনন্দে কেন তবে কান্নার সুর?
কেউ বলেন—মৃত্যু স্রষ্টার সান্নিধ্য,
কেউ বলেন—সবাই গেল, আমিও যাই একদিন।
পিতাকে দেখেছি মৃত্যুশয্যায় নির্ভীক,
মৃত্যু ভয় জয় করলে মানুষ হয় যুক্তিসঙ্গত।
জীবন-মৃত্যু একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ,
একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি অসম্পূর্ণ।
মৃত্যুকে আলিঙ্গনের সাহস যার আছে,
জীবনে তার স্বাধীনতা অবারিত।
জীবন সত্য, মৃত্যু সত্য—তারপরও…
এইটুকুই আমার মৃত্যু ভয়।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!