Dark Mode
Image
  • Friday, 30 January 2026

নিজার কাব্বানি: এক আহত পাখির গান

নিজার কাব্বানি: এক আহত পাখির গান

আরব বিশ্বের সাহিত্য আকাশে যে নামটি আজও গভীর আবেগ ও প্রতিবাদের প্রতীক, তিনি নিজার তাওফিক কাব্বানি। সিরিয়ার জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃত এই মানুষটি ছিলেন একাধারে কবি, কূটনীতিক, লেখক ও প্রকাশক। প্রেম, বিপ্লব, নারীর অনুভূতি এবং রাজনৈতিক প্রতারণার বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল নির্ভীক ও ধারালো।

নিজারের জীবনে প্রেম এসেছিল একাধিকবার, তবে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় চাচাতো বোন জাহরা আকবিকের সঙ্গে। সেই সম্পর্ক ভেঙে গেলেও জন্ম নেয় দুই সন্তান—হাদবা ও তাওফিক। বিশেষ করে তাওফিক ছিলেন বাবার প্রাণের অংশ। কিন্তু ২২ বছর বয়সে লন্ডনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তাওফিকের অকালমৃত্যু নিজারকে গভীর শোকের অতলে ঠেলে দেয়।

এরপর বৈরুতে কূটনীতিক দায়িত্ব পালনকালে তাঁর জীবনে আসেন বালকিস আল-রাবি—একজন ইরাকি কূটনীতিক ও শিক্ষিকা। কবিতা ও সৌন্দর্যের অনুরাগী বালকিসের চোখে নিজার খুঁজে পান সমুদ্রের গভীরতা। প্রেম থেকে সেই সম্পর্ক গড়ায় বিবাহে। বালকিসকে ঘিরেই নিজারের কবিতায় প্রেম হয়ে ওঠে উন্মাতাল, আবেগী ও বিদ্রোহী।

এই সময়েই নিজার কাব্বানি আরব বিশ্বে হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য এক কণ্ঠস্বর। উপনিবেশবাদ, স্বৈরাচারী শাসক এবং রাজনৈতিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা রীতিমতো ঝড় তোলে। প্রেমের কবি হয়েও তিনি ছিলেন সময়ের অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠ। তাঁর কলম ছিল তরবারির মতো—যা শাসকের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলত।

কিন্তু সুখ আবারও স্থায়ী হলো না। ১৯৮১ সালের ১৫ ডিসেম্বর, লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় বৈরুতে ইরাকি দূতাবাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন বালকিস। এই ঘটনাই নিজারের জীবন সম্পূর্ণ বদলে দেয়। প্রাণবন্ত, হাসিখুশি কবি যেন মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যান। প্রিয় বৈরুতে আর কখনো ফেরেননি তিনি।

এরপর জীবনের শেষ দুই দশক লন্ডনে কাটান নিঃসঙ্গতায়—সঙ্গী শুধু কলম, কাগজ আর অগাধ বেদনা। তাঁর কবিতাগুলো হয়ে ওঠে হারানো প্রেম, যন্ত্রণা আর মানুষের চাপা কান্নার ভাষা। লাখো মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় নেয় তাঁর আহত আত্মার গান।

১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যান নিজার কাব্বানি। কিন্তু ভালোবাসা, প্রতিবাদ আর মানবিকতার যে ভাষা তিনি রেখে গেছেন, তা আজও অমর। নিজার প্রমাণ করে গেছেন—ভালোবাসাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি বদলে দেয়।

নিজার কাব্বানি: এক আহত পাখির গান

Comment / Reply From