Dark Mode
Image
  • Friday, 30 January 2026

প্ল্যাকার্ড হাতে বন–জঙ্গলে পূর্ণতা: এক কিশোরীর পরিবেশ–লড়াই

প্ল্যাকার্ড হাতে বন–জঙ্গলে পূর্ণতা: এক কিশোরীর পরিবেশ–লড়াই

 

হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরের সড়কে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তাসফিয়া তাহসিন পূর্ণতা। লাল কালিতে লেখা— *‘হর্ন বাজিয়ে প্রাণীদের বিরক্ত করবেন না’*। কখনো সুন্দরবনের সবুজ প্রান্তরে, কখনো কক্সবাজারের কাছের সোনাদিয়া দ্বীপে একাই দাঁড়িয়ে মানুষকে জানান দেন— *‘সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে’, ‘বাংলার ফুসফুস সুন্দরবনকে রক্ষা করো’, ‘সোনাদিয়ার প্রাণিবৈচিত্র্য রক্ষা করো’*।

প্ল্যাকার্ড হাতে বন–জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো এই কিশোরীকে দেখলে অনেকেরই মনে পড়ে সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের কথা। সদ্য কৈশোর পেরোনো পূর্ণতাও পরিবেশ ও বন্য প্রাণী রক্ষায় নিজের জায়গা থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতির মাঝেও থেমে নেই তাঁর এই সচেতনতার কাজ।

### আলোকচিত্র থেকেই সচেতনতার পথ

পূর্ণতার পরিবেশ আন্দোলনের পেছনে রয়েছে তাঁর আলোকচিত্রপ্রীতির গল্প। শৈশবেই ক্যামেরার সঙ্গে পরিচয়, কৈশোরে এসে আগ্রহ জন্মায় পাখি ও বন্য প্রাণীর ছবি তোলায়। পূর্ণতা জানালেন, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে পরিবারের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ভ্রমণের সময় প্রথম বন্য পাখির ছবি তোলেন তিনি। পুকুরপাড়ে জামগাছের ডালে বসে থাকা কয়েকটি পাখিকে পানিতে ডুব দিতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলেন তারা মাছ ধরছে। পরে জানতে পারেন, পাখিগুলো আসলে স্নান করছিল। ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সেগুলো সবুজ সুইচোরা বা বাঁশপাতি পাখি।

সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে টেনে নেয় ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফির জগতে। ছবি তুলতে তুলতেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে পড়তে থাকেন দেশে পাখি ও বন্য প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ার খবর। তখনই মনে প্রশ্ন জাগে—এই ধারা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কি অনেক প্রাণী হারিয়ে যাবে? সেই ভাবনা থেকেই ছবি তোলার পাশাপাশি শুরু করেন সচেতনতা কার্যক্রম।

### প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ

২০২২ সালে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে বেড়াতে গিয়ে পূর্ণতা লক্ষ্য করেন, উদ্যানে গাড়ির অনুমোদিত গতিসীমা ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার হলেও অধিকাংশ চালক তা মানেন না। অতিরিক্ত গতি ও অহেতুক হর্নের কারণে প্রায়ই প্রাণী মারা যায়। তখনই তিনি ‘গতিসীমা মেনে চলুন, প্রাণী হত্যা রোধ করুন’—এমন বার্তা নিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে পড়েন।

এরপর মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, চট্টগ্রামের হাজারিখিল বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, রাজশাহীর পদ্মার চর—যেখানেই ছবি তুলতে গেছেন, সেখানেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়েছেন প্ল্যাকার্ড ও পোস্টারের মাধ্যমে।

### পরিবারের সমর্থন

পূর্ণতার এই উদ্যোগে পাশে আছেন তাঁর মা–বাবা। সাংবাদিক বাবা জিয়াউর রহমান ও মা কামরুন নাহার শরমিন মেয়েকে উৎসাহ দেন সবসময়। তাঁরা নিজেরাও মেয়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান, ছবি তোলেন, সচেতনতার কাজে সহযোগিতা করেন। মা–বাবার এই সমর্থনেই পাখির মতো ডানা মেলে ছুটে চলেন পূর্ণতা।

### স্বপ্ন আরও বড়

বন্য প্রাণীর ছবি তোলার পাশাপাশি পাখির ছবি আঁকতেও ভালোবাসেন পূর্ণতা। নিজের তোলা ও আঁকা ছবি নিয়ে একদিন প্রদর্শনী করার স্বপ্ন তাঁর। সেই প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ তিনি দিতে চান বন–পাহাড় ও হাওর এলাকার প্রান্তিক ও নৃগোষ্ঠীর শিশু-কিশোরদের সহায়তায়।

পূর্ণতার স্বপ্ন পূর্ণ হোক। বাঁচুক বন, প্রকৃতি, পাখি ও প্রাণিকুল। বাংলার মাটি ও জল ভরে উঠুক এক কিশোরীর পরিবেশবান্ধব স্বপ্নে।

প্ল্যাকার্ড হাতে বন–জঙ্গলে পূর্ণতা: এক কিশোরীর পরিবেশ–লড়াই

Comment / Reply From