Dark Mode
Image
  • Tuesday, 23 June 2026
ভূমিকম্পের আগেই কি টের পায় পশুপাখি?

ভূমিকম্পের আগেই কি টের পায় পশুপাখি?

ভূমিকম্প পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বিজ্ঞানীরা এখনো নির্ভুলভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হননি। তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি প্রশ্ন মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে—পশুপাখিরা কি মানুষের আগেই ভূমিকম্পের সংকেত বুঝতে পারে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণা এবং নানা ঘটনার পর্যবেক্ষণ বলছে, অনেক প্রাণী ভূমিকম্পের আগে অস্বাভাবিক আচরণ করে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত আসেনি, তবুও বিষয়টি বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে।

শিম্পাঞ্জিদের রহস্যময় আচরণ

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পরিচালিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কয়েকটি শিম্পাঞ্জির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। ভূমিকম্পপ্রবণ একটি এলাকায় বড় খাঁচায় রাখা শিম্পাঞ্জিগুলো দুটি মৃদু ভূমিকম্পের প্রায় আট ঘণ্টা আগে অস্বাভাবিকভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, তারা খাঁচার পরিচিত অংশ ছেড়ে এমন স্থানে চলে যায় যেখানে সাধারণত যেত না। পরে ওই এলাকায় ভূমিকম্প সংঘটিত হলে বিজ্ঞানীদের ধারণা হয়, প্রাণীগুলো হয়তো কোনোভাবে আগাম পরিবর্তন অনুভব করেছিল।

হাজার বছরের পুরোনো বিশ্বাস

পশুপাখি ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বুঝতে পারে—এ ধারণা নতুন নয়।

প্রায় ৩ হাজার বছর আগে চীনের মানুষ লক্ষ্য করেছিল, বিভিন্ন প্রাণী অস্বাভাবিক আচরণ করার পর অনেক সময় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। আবার প্রায় ৫০০ বছর আগে আমেরিকার আদিবাসীরা জলাশয়ে ক্যাটফিশ রেখে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন।

তাদের বিশ্বাস ছিল, মাছগুলো অস্বাভাবিকভাবে লাফালাফি বা অস্থির আচরণ করলে সেটি ভূমিকম্পের পূর্বসংকেত হতে পারে।

ভূমিকম্পের আগে প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণ

ইতিহাসে বিভিন্ন ভূমিকম্পের আগে প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণের বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

১৯৫৫ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়ায় এবং ১৯৭৬ সালে ইতালিতে বড় ভূমিকম্পের আগে অনেক প্রাণীর অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়। একইভাবে চীনে একাধিক ভূমিকম্পের আগে ইঁদুর, বিড়াল ও অন্যান্য প্রাণী ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে চলে আসে।

কুকুরের অস্বাভাবিক চিৎকার, গরু-ছাগল-ঘোড়ার অস্থিরতা এবং পাখিদের আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা হয়। পরবর্তীতে ওই এলাকাগুলোতে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।

সুনামির আগেই নিরাপদ স্থানে প্রাণীরা

২০০৪ সালের ভয়াবহ ভারত মহাসাগরীয় সুনামিতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে শ্রীলঙ্কার ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে থাকা অধিকাংশ বন্যপ্রাণী নিরাপদে বেঁচে যায়।

পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রাণীগুলো সুনামি ও ভূমিকম্পের আগেই উঁচু এলাকায় সরে গিয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি, ঘটনাটি গবেষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে।

কবুতর ও ফ্ল্যামিঙ্গোর বিস্ময়কর সংবেদনশীলতা

২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে ৫.৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের আগে নদীতে থাকা কয়েক ডজন ফ্ল্যামিঙ্গো হঠাৎ একসঙ্গে উড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়।

অন্যদিকে চীনা গবেষকেরা দেখেছেন, কবুতরের পা অত্যন্ত সূক্ষ্ম কম্পনের প্রতি সংবেদনশীল। তারা এমন কম্পনও অনুভব করতে পারে, যা অনেক সময় অত্যাধুনিক যন্ত্রেও সহজে ধরা পড়ে না।

একটি পরীক্ষায় দেখা যায়, ভূমিকম্পের আগে গবেষণায় ব্যবহৃত কবুতরগুলো অস্বাভাবিকভাবে উড়তে শুরু করে, যেন তারা আসন্ন বিপদের আভাস পাচ্ছে।

কীভাবে আগাম সংকেত বুঝতে পারে প্রাণীরা?

বিজ্ঞানীদের ধারণা, ভূমিকম্পের আগে পৃথিবী ও বায়ুমণ্ডলে কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। যেমন—

  • মাটির নিচে চাপের পরিবর্তন
  • ক্ষুদ্র কম্পন বা মাইক্রো-ভাইব্রেশন
  • ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পরিবর্তন
  • তাপমাত্রার ওঠানামা
  • বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের পরিবর্তন
  • শব্দতরঙ্গ বা নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ

মানুষ এসব পরিবর্তন অনুভব করতে না পারলেও কিছু প্রাণীর ইন্দ্রিয় অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় তারা আগে থেকেই এর প্রভাব টের পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

এখনো নিশ্চিত নয় বিজ্ঞান

যদিও বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তব ঘটনার পর্যবেক্ষণে প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণ এবং ভূমিকম্পের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে, তবুও এখনো এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যা নিশ্চিতভাবে বলে যে পশুপাখি ভূমিকম্পের নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাণীরা হয়তো পরিবেশের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো মানুষের চেয়ে আগে অনুভব করতে পারে। তবে সেই আচরণকে নির্ভুল পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

রহস্য এখনো অমীমাংসিত

পশুপাখিরা ঝড়, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা পরিবেশগত নানা সংকেত আগাম বুঝতে পারে—এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট ঐকমত্য রয়েছে। তাই ভূমিকম্পের ক্ষেত্রেও তাদের বিশেষ সংবেদনশীলতা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

তবে কীভাবে তারা এই সংকেত পায়, কোন প্রাণী সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে তারা বিপদের আভাস দিতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

ফলে পশুপাখির আচরণ ও ভূমিকম্পের সম্পর্ক আজও বিজ্ঞান জগতের অন্যতম আকর্ষণীয় রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।

Comment / Reply From