সোশ্যাল মিডিয়ায় মিলছে মানসিক স্বাস্থ্যের ‘পরামর্শ’, কতটা নিরাপদ?
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তথ্য ও পরামর্শ পেতে এখন অনেকেই চিকিৎসকের চেম্বারের পাশাপাশি ভরসা করছেন টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। উদ্বেগ, এডিএইচডি, ট্রমা কিংবা বিষণ্নতার মতো বিষয় নিয়ে পেশাদার মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের তৈরি ভিডিও কয়েক মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে লাখো মানুষের কাছে। সহজ ভাষায় জটিল বিষয় ব্যাখ্যা, প্রচলিত ভুল ধারণা ভাঙা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার কারণে এসব কনটেন্টের জনপ্রিয়তাও দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্বজুড়েই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, সামাজিক সংকোচ এবং প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর স্বল্পতার কারণে অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে প্রতি দুই লাখ মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। বিষণ্নতায় আক্রান্তদেরও খুব অল্প একটি অংশ পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান।
এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে তথ্য পাওয়ার একটি সহজ মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব বেশ স্পষ্ট। টিকটকে ‘অ্যাংজাইটি’ হ্যাশট্যাগের ভিউ ২০২১ সালের শেষ দিকে প্রায় ৬ বিলিয়ন থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেড়ে ১৬.১ বিলিয়নে পৌঁছায়। একইভাবে ‘মেন্টালহেলথ’ হ্যাশট্যাগের ভিউ ২০২২ সালের মার্চে ২৫.৩ বিলিয়ন থেকে ২০২৩ সালের আগস্টে ১০০ বিলিয়নেরও বেশি হয়। তবে এসব সংখ্যা পুরো মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্টের পরিমাণ নয়; নির্দিষ্ট হ্যাশট্যাগের ব্যবহার ও ভিউয়ের হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত।
কেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝুঁকছে মানুষ?
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অনলাইন কনটেন্টের প্রতি মানুষের আগ্রহের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ব্যবহারকারী এসব প্ল্যাটফর্মে সহমর্মিতা, মানসিক সমর্থন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল খুঁজে পান। কেউ নিজের অনুভূতি বা আচরণ বুঝতে চান, কেউ আবার সম্ভাব্য সমস্যার লক্ষণ সম্পর্কে জানতে কিংবা সহায়তার পথ খুঁজতে এসব কনটেন্ট দেখেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের উপযোগী সহজ ভাষা, অনলাইন কমিউনিটির সমর্থন এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিশেষ করে যারা একাকিত্ব বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের কাছে অনলাইন কমিউনিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্য পাওয়া আর চিকিৎসা নেওয়া এক নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া নিঃসন্দেহে উপকারী হতে পারে। কোনো ব্যক্তি নিজের অনুভূতি বা সমস্যাকে বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা পেতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারেন।
তবে অনলাইনে কোনো ভিডিও দেখা কিংবা নিজের উপসর্গের সঙ্গে সেটির মিল খুঁজে পাওয়া চিকিৎসার বিকল্প নয়। একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়ন, যথাযথ তথ্য এবং বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট দেখে নিজে নিজে কোনো মানসিক রোগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত সামাজিক সংকোচ কমাতে এর ভূমিকা। আগে যেসব বিষয় নিয়ে মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধা করতেন, এখন সেগুলো নিয়ে চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা সহজ ভাষায় আলোচনা করছেন।
পেশাজীবীরা বই, গবেষণাপত্র বা একাডেমিক আলোচনার সীমা পেরিয়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত আর্থিক সামর্থ্যের কারণে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার সুযোগ থেকে কেউ পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছেন না।
চিকিৎসকের সঙ্গে অনুসারীর দূরত্ব কোথায়?
তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও। অনেক অনুসারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত বার্তা পাঠিয়ে নিজেদের গুরুতর মানসিক সমস্যার কথা জানান এবং সরাসরি চিকিৎসা বা পরামর্শ চান।
কিন্তু অনলাইনে অচেনা একজন ব্যক্তিকে পর্যাপ্তভাবে মূল্যায়ন না করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে গুরুতর বা জরুরি পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ পরামর্শ যথেষ্ট নয়। এ কারণে চিকিৎসক ও অনুসারীর সম্পর্কের সীমারেখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
জনপ্রিয় মানেই বিশেষজ্ঞ নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো জনপ্রিয়তা ও যোগ্যতাকে এক করে দেখা। লাখো অনুসারী থাকা কিংবা কোনো ভিডিও কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া একজন ব্যক্তির পেশাগত দক্ষতার প্রমাণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন দৃশ্যমানতা এখন অনেক সময় মানুষের কাছে জ্ঞান ও যোগ্যতার বিকল্প মাপকাঠি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ একজন দক্ষ মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স ও পেশাগত অভিজ্ঞতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যালগরিদমের ফাঁদ
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অনলাইন কনটেন্টের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম। সাধারণত যে কনটেন্টে মানুষের আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়া বেশি, সেটিই আরও বেশি ব্যবহারকারীর সামনে আসে। ফলে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত দাবি কিংবা বিভ্রান্তিকর সেলফ-ডায়াগনোসিসও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একই ধরনের মতামত বা তথ্য বারবার সামনে আসার কারণে ব্যবহারকারীরা এক ধরনের ‘ইকো চেম্বার’-এর মধ্যেও আটকে যেতে পারেন। এতে নিজের ধারণার সঙ্গে মেলে এমন তথ্যই বারবার দেখা হয় এবং ভিন্ন বা সংশোধনমূলক তথ্য উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাণিজ্যিকীকরণ নিয়েও প্রশ্ন
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট এখন অনেক পেশাজীবীর জন্য পেশাগত পরিচিতি তৈরির মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। বিনামূল্যের ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের পর কেউ ব্যক্তিগত চিকিৎসা, অনলাইন কোর্স, বই কিংবা অন্যান্য সেবার দিকে অনুসারীদের নিয়ে যেতে পারেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থ উপার্জন করাই মূল সমস্যা নয়। মূল প্রশ্ন হলো—তথ্যটি কতটা নির্ভুল, দায়িত্বশীল ও নিরাপদ এবং তা মানুষকে প্রয়োজনীয় ও যথাযথ চিকিৎসার দিকে পরিচালিত করছে কি না।
সম্ভাবনা যেমন আছে, ঝুঁকিও তেমন
সবদিক বিবেচনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প বলা না গেলেও এটি সচেতনতা তৈরির শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ কমানো, মানুষের অভিজ্ঞতা বোঝার সুযোগ তৈরি, পারস্পরিক সমর্থন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সম্ভাবনাকে কার্যকর করতে হলে অনলাইন কনটেন্ট হতে হবে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য, দায়িত্বশীল এবং নিরাপদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কেউ যখন মানসিক সহায়তার খোঁজ শুরু করবেন, তখন সেই তথ্যের পরবর্তী ধাপ হিসেবে যেন যোগ্য পেশাজীবীর কাছে পৌঁছানোর পথও খোলা থাকে। কারণ অনলাইন পরামর্শ হয়তো সচেতনতার দরজা খুলতে পারে, কিন্তু প্রকৃত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন সঠিক মূল্যায়ন ও পেশাদার সেবা।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!