Dark Mode
Image
  • Wednesday, 21 October 2026
খাবার অপচয় বাড়ছে, ক্ষুধা রয়েই গেছে

খাবার অপচয় বাড়ছে, ক্ষুধা রয়েই গেছে

 

বিশ্বে মাথাপিছু বছরে ১৩২ কেজি খাবার অপচয়, গৃহস্থালি অপচয়ে শীর্ষে মালদ্বীপ

বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচ ভাগ খাবারের প্রায় এক ভাগই শেষ পর্যন্ত অপচয় হয়। বিপুল পরিমাণ খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটে। অন্যদিকে, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনো পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। খাদ্য অপচয় ও ক্ষুধার এই বৈপরীত্য বিশ্বব্যাপী খাদ্যব্যবস্থার বড় সংকটগুলোর একটি।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে ভোক্তা পর্যায়ে মোট প্রায় ১০৫ কোটি টন খাবার অপচয় হয়েছে। মাথাপিছু হিসাবে এর পরিমাণ বছরে প্রায় ১৩২ কেজি। এর মধ্যে বাসাবাড়িতেই অপচয় হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ খাবার। <Cite refs={["turn964271search1","turn964271search12"]}/>

অন্যদিকে, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। অর্থাৎ, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যাপ্ত খাবার পায়নি। <Cite refs={["turn964271search3","turn964271search4"]}/>

তিন জায়গায় সবচেয়ে বেশি খাবার অপচয়

ইউএনইপির হিসাব অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে খাবার অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটে বাসাবাড়িতে। মোট অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশের জন্য দায়ী পরিবারগুলো। রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অপচয় হয় প্রায় ২৮ শতাংশ খাবার। বাকি ১২ শতাংশ নষ্ট হয় দোকানপাটে।

২০২২ সালে বিশ্বে অপচয় হওয়া ১০৫ কোটি টন খাবার পরিবহন করতে হলে ২০ টন ধারণক্ষমতার প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ ট্রাকের প্রয়োজন হতো। এই হিসাব থেকেই বোঝা যায়, খাবারের অপচয়ের পরিমাণ কতটা বিশাল। <Cite refs={["turn964271search1","turn964271search7"]}/>

তবে সব খাবার নষ্ট হওয়ার কারণ এক নয়। বাসাবাড়িতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রান্না, কেনা খাবার সময়মতো ব্যবহার না করা কিংবা খাবার সংরক্ষণে অবহেলা অপচয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে। রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন এবং দোকানে বিক্রি না হওয়া পণ্যও এর অংশ।

মাথাপিছু গৃহস্থালি অপচয়ে শীর্ষে মালদ্বীপ

দেশভেদে খাবার অপচয়ের চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইউএনইপির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে মালদ্বীপে মাথাপিছু গৃহস্থালি খাদ্য অপচয়ের অনুমান বছরে প্রায় ২০৭ কেজি, যা প্রতিবেদনের দেশভিত্তিক হিসাবগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এই পরিমাণ বৈশ্বিক গৃহস্থালি অপচয়ের গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: বৈশ্বিক গড় ১৩২ কেজি বলতে বাসাবাড়ি, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রয় পর্যায়ের মোট অপচয়ের মাথাপিছু হিসাব বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে, মালদ্বীপের ২০৭ কেজির পরিসংখ্যানটি শুধু গৃহস্থালি পর্যায়ের অপচয়ের হিসাব। তাই দুটি সংখ্যার মধ্যে সরাসরি তুলনা করার সময় এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখতে হবে। <Cite refs={["turn414379search48","turn964271search1"]}/>

ইউএনইপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণ আবহাওয়ার কিছু দেশে বাসাবাড়িতে খাবার অপচয়ের পরিমাণ বেশি হতে পারে। এর সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে তাজা খাবারের ব্যাপক ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত হিমায়ন ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। তবে দেশভিত্তিক অনুমানের নির্ভরযোগ্যতা এক নয়। ফলে এসব সংখ্যাকে তুলনামূলক হিসাব হিসেবে দেখা উচিত।

খাবার উৎপাদনের আগেই নষ্ট হচ্ছে বিপুল সম্পদ

খাবার অপচয়ের হিসাব কেবল রান্না করা খাবার ফেলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফসল কাটার পর থেকে দোকানে পৌঁছানোর আগেও বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় এই ক্ষতি ঘটে।

এফএওর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত খাবারের প্রায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশ খামার থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যায়। এর বাইরে দোকানপাট, খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ করা খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ অপচয় হয়। <Cite refs={["turn414379search1","turn414379search5"]}/>

ফলমূল ও শাকসবজির মতো পচনশীল খাদ্যের ক্ষেত্রে যথাযথ সংরক্ষণব্যবস্থার অভাব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সময়মতো বাজারজাত করতে না পারা, পরিবহনে বিলম্ব কিংবা হিমাগারের অপ্রতুলতা খাবারের ক্ষতি বাড়ায়। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন ফেরত আসে না, তেমনি ভোক্তার কাছেও খাবার পৌঁছানোর সুযোগ হারিয়ে যায়।

ক্ষুধা কমলেও সংকট কাটেনি

বিশ্বে ক্ষুধার হার কমার কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ক্ষুধার হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে অঞ্চলভেদে পরিস্থিতি এক নয়। আফ্রিকায় ২০২৫ সালে প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগেছে। এশিয়ায় এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ অপুষ্টির শিকার হয়েছে। <Cite refs={["turn964271search3","turn964271search5"]}/>

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১২২টি দেশের পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে আটটি দেশে ক্ষুধার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশগুলো হলো সোমালিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ, মাদাগাস্কার, বুরুন্ডি, দক্ষিণ সুদান, সুদান ও ইয়েমেন। এর মধ্যে সাতটি আফ্রিকায় অবস্থিত। সোমালিয়া সূচকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। <Cite refs={["turn414379search10","turn414379search13"]}/>

বিশ্বে পর্যাপ্ত খাবার উৎপাদিত হলেও তা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না। দারিদ্র্য, সংঘাত, খাদ্যের উচ্চমূল্য, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা ও জলবায়ুজনিত সংকট মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, খাবারের সঠিক বণ্টন ও অপচয় কমানোও জরুরি।

খাবার অপচয়ে অর্থনীতির ক্ষতি

খাবার নষ্ট হলে শুধু খাবারের মূল্যই হারিয়ে যায় না; এর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে ব্যবহৃত অর্থ, শ্রম, পানি, জমি ও জ্বালানিও অপচয় হয়। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে খাদ্য অপচয় ও ক্ষতির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। <Cite refs={["turn414379search4","turn414379search9"]}/>

এ অপচয়ের পরিবেশগত প্রভাবও ব্যাপক। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, খাবারের ক্ষতি ও অপচয় বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। উৎপাদিত হলেও শেষ পর্যন্ত খাওয়া হয় না—এমন খাবারের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ প্রায় ১৪০ কোটি হেক্টর, যা বিশ্বের কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশ। <Cite refs={["turn414379search1","turn414379search7"]}/>

ফেলে দেওয়া খাবার ভাগাড়ে পচতে থাকলে মিথেনের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হতে পারে। ফলে খাদ্য অপচয় কমানো শুধু অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের বিষয় নয়; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

খাবারের অপচয় কমাতে কী করা যায়?

খাদ্য অপচয় কমানোর শুরু হতে পারে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেই। বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় খাবারের তালিকা তৈরি করা, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কেনা এবং খাবার সংরক্ষণের মেয়াদ খেয়াল রাখা অপচয় কমাতে সাহায্য করতে পারে।

একইভাবে, বাড়িতে প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা, অবশিষ্ট খাবার নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা এবং খাওয়ার উপযোগী খাবার অকারণে ফেলে না দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। রেস্তোরাঁ ও দোকানপাটেও খাবারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি, সংরক্ষণ এবং নিরাপদে উদ্বৃত্ত খাবার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও প্রয়োজন উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা, কার্যকর সরবরাহশৃঙ্খল এবং খাদ্য অপচয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ। বিশেষ করে পচনশীল কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো এবং খাদ্য সংরক্ষণের সুবিধা বাড়ানো গেলে ফসল কাটার পরের ক্ষতি কমানো সম্ভব।

বিশ্বে একদিকে কোটি কোটি মানুষের ক্ষুধা, অন্যদিকে উৎপাদিত খাবারের বিশাল অংশ অপচয়—এই বৈপরীত্য খাদ্যব্যবস্থার দুর্বলতাকে সামনে আনে। ক্ষুধা কমানোর জন্য শুধু আরও খাবার উৎপাদন নয়, উৎপাদিত খাবার যেন নষ্ট না হয় এবং যাদের প্রয়োজন তাদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


Description: বিশ্বে বছরে মাথাপিছু গড়ে ১৩২ কেজি খাবার অপচয় হয়, অথচ ২০২৫ সালে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। মালদ্বীপে মাথাপিছু গৃহস্থালি খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় অপুষ্টির পরিস্থিতি এবং খাদ্য অপচয়ের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি সম্পর্কে জানুন।

Tag words: খাবার অপচয়, খাদ্য নিরাপত্তা, বিশ্ব ক্ষুধা, মালদ্বীপ, জাতিসংঘ, ইউএনইপি, এফএও, অপুষ্টি, খাদ্য সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, গ্রিনহাউস গ্যাস, খাদ্য সংরক্ষণ, বিশ্ব অর্থনীতি

Keywords: বিশ্বে বছরে খাবার অপচয়, মাথাপিছু খাদ্য অপচয়, মালদ্বীপে খাবার অপচয়, ২০২৫ সালে বিশ্ব ক্ষুধার পরিসংখ্যান, বিশ্বে অপুষ্টির হার, খাদ্য অপচয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি, খাদ্য অপচয় ও জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৬, খাবার অপচয় কমানোর উপায়

Short, interesting heading: খাবার অপচয় বাড়ছে, ক্ষুধা রয়েই গেছে

 

Comment / Reply From