Dark Mode
Image
  • Tuesday, 23 June 2026
ঝামেলামুক্ত মাছে বদলে গেল লিজার জীবন

ঝামেলামুক্ত মাছে বদলে গেল লিজার জীবন

মাগুরা সদরের পারনান্দুয়ালী বেপারী পাড়ার গৃহবধূ লিজা এখন জেলার একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ‘রেডি টু কুক ফিশ’ সেবা চালুর মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বরং স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান ও ভোক্তাদের জন্য সহজলভ্য মাছ সরবরাহের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করেছেন।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়ন এবং অলটারনেটিভ ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এডিআই)-এর বাস্তবায়নে ২০২৪ সালের ২৮ জুন মাগুরায় প্রথমবারের মতো শুরু হয় এই উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় লিজা পেয়েছেন ডিপ ফ্রিজ, দোকান উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহায়তা, মাছ সংগ্রহের মূলধন, প্রচারণার জন্য লিফলেট ও সাইনবোর্ড।

নিজ বাড়ির পাশেই ছোট্ট একটি দোকান গড়ে তুলে স্বামী জাকির হোসেনের সহযোগিতায় তিনি শুরু করেন মাছ প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রির কাজ। বর্তমানে নদী, সাগর, ঘের এবং পুকুরের বিভিন্ন প্রজাতির দেশি ও সামুদ্রিক মাছ সংগ্রহ করে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে ধোয়া, কাটা, বাছাই এবং প্যাকেটজাত করে বিক্রি করা হচ্ছে।

এই সেবার ফলে ক্রেতারা এখন বাজারে গিয়ে মাছ পরিষ্কার ও কাটার ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি রান্নার উপযোগী মাছ কিনতে পারছেন। অফলাইনের পাশাপাশি অনলাইনেও অর্ডার গ্রহণ করায় গ্রাহকদের কাছে সেবাটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী এবং ব্যস্ত পরিবারগুলোর কাছে ‘রেডি টু কুক ফিশ’ বেশ সমাদৃত। মাগুরা ওয়ার্ল্ড নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী সুফিয়া খাতুন বলেন, হোস্টেলে থেকে পড়াশোনার কারণে বাজারে গিয়ে মাছ কেনা ও প্রস্তুত করা তার জন্য কঠিন ছিল। এখন অনলাইনে অর্ডার দিয়ে সহজেই প্রয়োজনীয় মাছ সংগ্রহ করতে পারছেন, যা তার সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচাচ্ছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান স্কুল শিক্ষিকা মারুফা সুলতানা। তিনি বলেন, কর্মব্যস্ত জীবনে মাছ পরিষ্কার ও কাটার ঝামেলার কারণে অনেক সময় মাছ খাওয়া কমে গিয়েছিল। কিন্তু এখন প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সময় অর্ডার দিয়ে সহজেই পরিবারের মাছের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

লিজার এই উদ্যোগ শুধু ব্যবসায়িক সফলতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে দুজন নারী নিয়মিত কাজ করছেন। মাছ পরিষ্কার, কাটা এবং প্যাকেটজাত করার মাধ্যমে তারা মাসে অতিরিক্ত আয় করছেন, যা তাদের পরিবার পরিচালনা ও সন্তানের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে যুক্ত সকিনা খাতুন জানান, আগে তিনি শুধু গৃহস্থালির কাজেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এখন লিজার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করছেন, যা তার সংসারের জন্য বড় সহায়তা।

লিজা বলেন, ছোটবেলা থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল। সংসারের দায়িত্বের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের মাছ কাটার ঝামেলা কমাতে পারলে একটি কার্যকর ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘রেডি টু কুক ফিশ’ উদ্যোগ, যা বর্তমানে গ্রাহকদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে ব্যবসার পরিধি বাড়িয়ে আরও মানুষের কাছে এই সেবা পৌঁছে দিতে চান। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও তার লক্ষ্য।

এডিআই-এর মৎস্য কর্মকর্তা সামিউর রহমান বলেন, লিজার মতো উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর নারী উদ্যোক্তা তৈরির পথ আরও সুগম হবে। এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে অন্যান্য জেলার জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে।

সম্প্রতি মাগুরা সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম শাহজাহান সিরাজ লিজার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে উদ্যোগটির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু একজন নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।

ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও গ্রাহক আস্থার কারণে ‘রেডি টু কুক ফিশ’ এখন মাগুরায় নারী উদ্যোক্তাদের সফলতার এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

Comment / Reply From