মার্কিন সাময়িকীর তালিকায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী তনিমা, বদলে দিতে পারেন পৃথিবী
পৃথিবী বদলে দিতে পারে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী তনিমার গবেষণা, বলছে মার্কিন সাময়িকী
ছোটবেলায় লোডশেডিং হলেই আকাশভরা তারা দেখতে ছাদে কিংবা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতেন তনিমা তাসনিম। ঢাকার বাড্ডায় বেড়ে ওঠা সেই কিশোরীর মনে তখনই জন্ম নেয় মহাকাশ আর গ্রহ-নক্ষত্র নিয়ে অদম্য কৌতূহল। মায়ের মুখে মহাকাশের গল্প শুনতে শুনতেই একদিন নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নের রূপ বদলেছে, তবে মহাকাশের প্রতি ভালোবাসা একটুও কমেনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত তনিমা তাসনিম গবেষণা করছেন মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় বিষয় ‘সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল’ বা অতিমহাকায় কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে। বিগ ব্যাংয়ের পর এসব কৃষ্ণগহ্বর কীভাবে দ্রুত আকার ও ভর বৃদ্ধি করেছে এবং গ্যালাক্সির বিকাশে কী ভূমিকা রাখছে, তা নিয়েই তাঁর গবেষণা।
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী Scientific American তাদের জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় ‘The Future of Science’ শিরোনামে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় ২৮ জন তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম। সাময়িকীটির ভাষ্য, এই গবেষকদের কাজ ভবিষ্যতে পৃথিবী বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
এটি অবশ্য তনিমার প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। ২০২০ সালে মার্কিন বিজ্ঞান সাময়িকী Science News তাঁকে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য ১০ তরুণ বিজ্ঞানীর একজন হিসেবে নির্বাচন করে। এছাড়া তাঁর গবেষণা The Astrophysical Journal-এর অন্যতম জনপ্রিয় ও সর্বাধিক ডাউনলোড হওয়া গবেষণাপত্রের স্বীকৃতিও পেয়েছে।
তনিমার একাডেমিক যাত্রাও সমানভাবে উজ্জ্বল। তিনি যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাভারফোর্ড কলেজ এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পিএইচডি সম্পন্ন করেন আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সাবেক সভাপতি ক্লডিয়া মেগান উরির তত্ত্বাবধানে। পাশাপাশি নাসা ও সার্নের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করার সুযোগও পেয়েছেন।
বর্তমানে গবেষণার পাশাপাশি ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতাও করছেন তনিমা। তাঁর ভাষায়, গবেষণা এবং শিক্ষকতা—দুটিই তাঁর সমান প্রিয়। কারণ, এই দুই ক্ষেত্রেই মানুষের সঙ্গে নতুন ধারণা ভাগ করে নেওয়া এবং জ্ঞানচর্চার সুযোগ রয়েছে।
বিদেশে অবস্থান করলেও দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ভুলে যাননি তিনি। তাঁর প্রথম পিএইচডি শিক্ষার্থী একজন বাংলাদেশি। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠন Women in STEM (WiSTEM)-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করে আসছেন তিনি।
শৈশব থেকেই বই পড়া ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় নেশা। কমিকস থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সাহিত্য, কল্পকাহিনি—সব ধরনের বইই আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। পাশাপাশি ছবি আঁকা ও গান শেখার মতো সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন। এসব অভ্যাসই তাঁর কল্পনার জগৎকে বিস্তৃত করেছে এবং মহাকাশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে।
নভোচারী হওয়ার শৈশবের স্বপ্নটি এখনো পুরোপুরি ফিকে হয়ে যায়নি। হাসিমুখেই তনিমা বলেন, সেই স্বপ্নের আশা তিনি এখনো ছাড়েননি।
বাংলাদেশের এই মেধাবী বিজ্ঞানীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। তাঁর গবেষণা যেমন মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনে ভূমিকা রাখছে, তেমনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নামও উজ্জ্বল করছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!