ছাদবাগানেই বদলে গেল জীবন, মাসে লাখ টাকা আয় শারমিনের
শহরের ব্যস্ত জীবনে অনেকের কাছেই ছাদ মানে কেবল খোলা জায়গা। তবে রাজশাহীর বিনোদপুরের শারমিন আক্তারের কাছে সেই ছাদই হয়ে উঠেছে স্বপ্ন, সাফল্য ও স্বাবলম্বিতার ঠিকানা। শখের বশে কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু করা ছাদবাগান এখন পরিণত হয়েছে একটি সফল উদ্যোগে। চারা ও টব বিক্রি করে তিনি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় এক লাখ টাকা আয় করছেন।
শুধু ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগের জন্য জাতীয় পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছেন শারমিন। ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদবাগান বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
শখ থেকেই শুরু
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০০১–০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন শারমিন আক্তার। ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি তার আলাদা টান ছিল। পড়াশোনা ব্যবসায় বিষয়ে হলেও কৃষি ও বাগান করার স্বপ্ন কখনো ছাড়েননি।
২০২২ সালে নিজের বাড়ির ছাদে অল্প কয়েকটি গাছ দিয়ে শুরু হয় তার ছাদবাগানের পথচলা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে তিন স্তরে সাজানো হয়েছে তার বাগান।
এখন সেখানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১১০ প্রজাতির সাড়ে তিন হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। নিচতলা থেকে ছাদ—পুরো বাড়িটিই যেন পরিণত হয়েছে সবুজের এক ব্যতিক্রমী জগতে।
‘নেচার’স টাচ’ এখন ব্যবসার ঠিকানা
শারমিনের বাগানের আনুষ্ঠানিক নাম ‘Nature’s Touch’। স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি অবশ্য ‘কৃষিবাড়ি’ নামেই বেশি পরিচিত।
এখানে রয়েছে ফুল, ফল, সবজি, ইনডোর প্ল্যান্ট, ঔষধি গাছ, বিরল প্রজাতির উদ্ভিদসহ নানা ধরনের গাছ। অ্যাডেনিয়াম, অ্যাগলোনিমা, এনথুরিয়াম, পিস লিলি, স্নেক প্ল্যান্ট, সাকুলেন্ট, ক্যাকটাস, ফার্ন, মানি প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন শৌখিন গাছ রয়েছে বাগানে।
ঔষধি উদ্ভিদের মধ্যে আছে লেমন গ্রাস, স্টেভিয়া, কালমেঘ, ইনসুলিন গাছ, নিম, রোজমেরি, অরেগানো ও পাথরকুচি। পাশাপাশি সাদা জাম, ফিডল লিফ ফিগ, সাইকাসসহ বিভিন্ন বিরল প্রজাতির গাছও সংরক্ষণ করছেন তিনি।
চারা বিক্রিতেই মাসে লাখ টাকা
বর্তমানে অনলাইন ও অফলাইন—দুই মাধ্যমেই বিভিন্ন প্রজাতির চারা ও টব বিক্রি করেন শারমিন। এই ব্যবসা থেকে তার মাসিক আয় প্রায় এক লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে আয় প্রায় ১২ লাখ টাকা।
তার উদ্যোগে বর্তমানে তিনজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও তার বাগানের চারার জন্য অর্ডার আসে। কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় গাছ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
ভবিষ্যতে রাজশাহীতে আরও বড় পরিসরে কাজ করে অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চান এই উদ্যোক্তা।
ফল-সবজিরও চাষ হচ্ছে ছাদে
শুধু শৌখিন গাছ নয়, বাগানে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজিও। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, স্ট্রবেরি, রামবুটান, অ্যাভোকাডো ও আপেলসহ নানা ফলের গাছ রয়েছে।
পাশাপাশি মরিচ, টমেটো, লাউ, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শসা, বেগুন, করলা ও সজনেসহ বিভিন্ন সবজিও চাষ করছেন তিনি।
দেশীয় গাছ সংরক্ষণেও রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। কর্পূর, অশোক, হিজল, পলাশ, মহুয়া ও বটের মতো গাছও তার সংগ্রহে রয়েছে।
স্বামীর সহযোগিতায় এগিয়ে চলা
সংসার ও সন্তানদের দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিদিন বাগানের পরিচর্যায় সময় দেন শারমিন। এ কাজে নিয়মিত সহযোগিতা করেন তার স্বামী মোহা. জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি জানান, গাছের প্রতি স্ত্রীর ছোটবেলার আগ্রহ থেকেই এই উদ্যোগের শুরু। বিভিন্ন জায়গা থেকে চারা সংগ্রহ করা, ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যবসার বিভিন্ন কাজে তিনি স্ত্রীকে সহযোগিতা করেন।
দুজনের সম্মিলিত পরিশ্রমেই ছোট্ট শখের বাগানটি আজ একটি সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় পুরস্কারে মিলেছে স্বীকৃতি
শারমিনের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি এসেছে জাতীয় পর্যায় থেকে। ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সৃজিত ছাদবাগান বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।
এই অর্জনে স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত শারমিন। তার মতে, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হওয়ায় এই পুরস্কার তার কাছে বিশেষ আনন্দের।
‘প্রথমে ধাক্কা আসবেই’
বাগান করার শুরুতে অনেকের কাছ থেকেই কটূক্তি শুনতে হয়েছে বলে জানান শারমিন। অনেকে তার উদ্যোগকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন বাগান বড় হয়েছে এবং সাফল্য এসেছে, তখন সেই মানুষগুলোর অনেকেই এখন পরামর্শ নিতে আসেন।
তার ভাষায়, কোনো কাজে শুরুতে বাধা বা সমালোচনা এলেই থেমে গেলে চলবে না। ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে একসময় সেই কাজই সাফল্যের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান
নারীদের উদ্দেশে শারমিনের পরামর্শ, সংসারের কাজের পাশাপাশি নিজের জন্যও কিছু সময় বের করা উচিত। অবসর সময় শুধু বিনোদনে না দিয়ে কোনো একটি কাজ শেখা বা ছোট উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে। শুরুতে ব্যর্থতা বা বাধা এলেও হতাশ না হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার বিশ্বাস, একটি ছোট উদ্যোগই ভবিষ্যতে একজন নারীর আয়ের স্থায়ী উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ছাদবাগান হতে পারে পরিবেশ ও আয়ের সমাধান
রাজশাহীর কৃষি কর্মকর্তারাও শারমিনের উদ্যোগকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শহরাঞ্চলে ছাদবাগান পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপ কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ার শহরগুলোতে ছাদে সবুজায়নের গুরুত্ব আরও বেশি।
শারমিনের গল্প তাই কেবল একটি ছাদবাগানের সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে, ইচ্ছা ও পরিশ্রম থাকলে শহরের ছোট্ট একটি ছাদও হতে পারে সবুজের ঠিকানা, পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ এবং একই সঙ্গে আয়ের একটি কার্যকর মাধ্যম।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!