পড়াশোনার পাশেই দক্ষতার কারিগর আরিফ
পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন আরিফ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ২০২১ সালে শুরু করেন ‘নন-একাডেমি’। কয়েক বছরের পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করেছে। কেউ পেয়েছেন চাকরির সুযোগ, কেউ আবার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে এগিয়েছেন।
আরিফের প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ১১ জন স্থায়ী কর্মী কাজ করছেন। এর বাইরে রয়েছেন বেশ কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক সদস্য। নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে তিনি তৈরি করেছেন নিজের আলাদা পরিচয়।
ব্যর্থতা থেকেই নতুন শুরুর গল্প
আরিফের উদ্যোক্তা হওয়ার পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। করোনাকালে তার প্রথম স্টার্টআপটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই ব্যর্থতায় থেমে না গিয়ে ঘরে বসে বিভিন্ন কাজের চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। পরে অ্যাডটেক খাতে কাজ করার সুযোগ পান।
সেখানে কাজ করতে গিয়ে দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তার নজরে আসে। তিনি উপলব্ধি করেন, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতাও তরুণদের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় ‘নন-একাডেমি’র ধারণা।
আরিফের ভাষায়, দেশে ভালো কিছু করতে হলে বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে—এমন ধারণা বদলানো দরকার। একাডেমিক শিক্ষার বাইরেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে সফল হওয়া সম্ভব—এমন বার্তাই দিতে চান তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ
২০২১ সালের ২১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘নন-একাডেমি’। প্রতিষ্ঠানটিতে ব্লকচেইন, ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং ও ওয়েব ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক কোর্স চালু করা হয়েছে।
এখানে কোর্স করার জন্য বড় কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই। প্রয়োজন প্রাথমিক কম্পিউটার জ্ঞান এবং শেখার আগ্রহ। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিচয়ের চেয়ে তাদের দক্ষতা ও আগ্রহকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ক্লাসরুম থেকে উদ্যোক্তার লড়াই
পড়াশোনার চাপের মধ্যেও আরিফ নিয়মিত নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজ চালিয়ে গেছেন। পরীক্ষার আগের দিনেও লাইভ ক্লাস নেওয়া কিংবা ব্যস্ততার মধ্যেও কোর্সের কনটেন্ট তৈরি—সবকিছুতেই সক্রিয় ছিলেন তিনি।
উদ্যোক্তা হিসেবে তার অনুপ্রেরণার তালিকায় রয়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা স্টিভ জবস ও ইলন মাস্ক। তাদের মতো মানুষের জীবন ও কাজ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মতো কিছু তৈরি করতে চান আরিফ।
তার লক্ষ্য শুধু একটি ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা মানুষের দক্ষতা বাড়াবে এবং তাদের কর্মজীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে।
১,৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর পথচলায় সহায়তা
অল্প সময়ের মধ্যেই ‘নন-একাডেমি’র মাধ্যমে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষার্থী দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পেয়েছেন। তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে চাকরি পেয়েছেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন।
আরিফ মনে করেন, তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও শেখার সুযোগ দেওয়া গেলে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু কোর্স শেষ করানো নয়, বাস্তব জীবনে সেই দক্ষতার প্রয়োগ নিশ্চিত করাকেও তিনি গুরুত্ব দেন।
সামনে আরও বড় পরিকল্পনা
বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ভবিষ্যতে অফলাইন কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে আরিফের। তার স্বপ্ন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক একটি বিকল্প শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।
যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগবে—এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে।
আরিফের বার্তা, “লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, শেখা শুরু করুন, হাল ছাড়বেন না। নিজের স্কিল দিয়েই আপনি নিজের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারেন।”
আরিফের গল্প তাই শুধু একজন তরুণ উদ্যোক্তার সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি উদাহরণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!