দু’বার ক্যানসার জয়, তবু ভাঙেননি রায়না মাহমুদ
জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো কখনো কখনো মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার কাউকে করে তোলে আরও দৃঢ়। দু’বার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই, স্বামীর দীর্ঘ অসুস্থতা এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে হারানোর বেদনা—সবকিছু পেরিয়েও নিজের সাহস হারাননি রায়না মাহমুদ। তাঁর গল্প শুধু একজন ক্যানসারজয়ীর নয়, এটি এক সংগ্রামী নারীর অবিচল মানসিক শক্তির গল্প।
ঢাকার গ্রিন রোডের বাসায় এখনো দেয়ালজুড়ে ঝুলছে প্রয়াত ফ্যাশন আলোকচিত্রী চঞ্চল মাহমুদের স্মৃতি। সেই স্মৃতির মাঝেই দিন কাটে রায়না মাহমুদের। বর্তমানে তিনি নিজের বুটিক হাউস ‘রায়নাস ক্রিয়েশন’ নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
হঠাৎ ধরা পড়ে ক্যানসার
সবকিছুর শুরু স্তনে একটি অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড থেকে। প্রথমে বিষয়টি হালকাভাবে নিলেও পরে মায়ের স্মৃতি তাঁকে শঙ্কিত করে তোলে। কারণ, তাঁর মা স্তন ক্যানসারেই মারা গিয়েছিলেন। চিকিৎসকের পরামর্শে বায়োপসি করানোর পর জানা যায়, সেটি ক্যানসার এবং দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে।
প্রথম রিপোর্ট বিশ্বাস করতে না পেরে আবার পরীক্ষা করান রায়না মাহমুদ। দ্বিতীয়বারও একই ফল আসে। এরপর দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
কেমোথেরাপির ভয়াবহ দিনগুলো
ক্যানসারের চিকিৎসা শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, মানসিক ও আর্থিক চাপও নিয়ে আসে। সেই সময় স্বামী চঞ্চল মাহমুদও গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। চারবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছিলেন।
বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় শুরু হয় রায়নার চিকিৎসা। একের পর এক কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন—সব মিলিয়ে জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
রায়না মাহমুদ জানান, দ্বিতীয় কেমোর পর থেকেই চুল ঝরতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ভ্রু ও চোখের পাপড়িও পড়ে যায়। নিজের পরিবর্তিত চেহারা আয়নায় দেখে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
তিনি বলেন, “মনে হতো কেউ যেন আমাকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে।”
অর্থনৈতিক সংকট ও মানসিক যুদ্ধ
প্রতিটি কেমোথেরাপির খরচ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার টাকা। করোনাকালে কাজ বন্ধ থাকায় চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে যায়। তবুও পরিবার, সন্তান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থন তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে।
কঠিন সময়েও স্বামী চঞ্চল মাহমুদ সবসময় পাশে ছিলেন। কেমো নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে আবার স্বামীর লাইফ সাপোর্টের পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছেন রায়না।
আবারও ফিরে আসে ক্যানসার
দীর্ঘ চিকিৎসার পর যখন মনে হয়েছিল সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসছে, ঠিক তখনই আট মাস পর আবার ধরা পড়ে ক্যানসার। নতুন করে শুরু হয় চিকিৎসা। এবার কেমো না লাগলেও নিতে হয় ১৬টি রেডিয়েশন থেরাপি।
রায়না বলেন, “অনেকের ১০-১৫ বছরেও ক্যানসার ফিরে আসে না। আমার জীবনে খুব দ্রুতই আবার ফিরে এল।”
তবে দ্বিতীয়বারও সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি।
স্বামীকে হারানোর বেদনা
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্ট্রোক করেন চঞ্চল মাহমুদ। ধীরে ধীরে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। কয়েক মাস অসুস্থ থাকার পর ২০ জুন মৃত্যুবরণ করেন এই খ্যাতিমান আলোকচিত্রী।
স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন একাই ছিলেন রায়না মাহমুদ। এখনো বাসার প্রতিটি কোণ তাঁকে চঞ্চল মাহমুদের কথা মনে করিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, “এই বাসার সবখানেই ওর স্মৃতি। মনে হয়, বাসা ছেড়ে গেলে আমি ভেঙে পড়ব।”
লড়াইয়ের নামই জীবন
দু’বার ক্যানসার জয়, স্বামীর অসুস্থতা, আর্থিক সংকট ও প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক—সব মিলিয়ে রায়না মাহমুদের জীবন যেন এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। তবুও তিনি থেমে যাননি। নিজের কাজ, স্মৃতি আর সাহস নিয়েই নতুনভাবে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
Comment / Reply From
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!