প্যারিসের পার্কে বইয়ের বাক্স, জ্ঞানের নীরব বিপ্লব
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি পার্ক। শতবর্ষ ছুঁইছুঁই বয়সী এক বৃদ্ধ ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। বুকে আগলে রাখা কয়েকটি বই নিয়ে তিনি থামলেন একটি ছোট কাঠের বাক্সের সামনে। যত্ন করে বইগুলো সেখানে রেখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভেতরের তাকগুলোর দিকে। এরপর একটি নতুন বই হাতে নিয়ে বেঞ্চে বসে ডুবে গেলেন পাঠের জগতে।
প্রথম দেখায় এটি সাধারণ একটি কাঠের বাক্স মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ সামাজিক উদ্যোগ। ফরাসিরা একে বলে ‘বোয়াত আ লিভর’ (Boîte à Livres), অর্থাৎ বইয়ের বাক্স। কেউ কেউ এটিকে ‘রাস্তার লাইব্রেরি’ বা ‘পড়ার বাক্স’ বলেও অভিহিত করেন।
স্বচ্ছ কাচের দরজাযুক্ত ছোট এই বাক্সগুলোতে থাকে বিভিন্ন ধরনের বই। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৫০টির মতো বই রাখা হয়। যে কেউ নিজের পড়া শেষ হওয়া বই এখানে রেখে যেতে পারেন, আবার অন্য কারও রেখে যাওয়া বই বিনা খরচে নিয়ে পড়তে পারেন।
মূলত ‘বই বিনিময়’ ধারণাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই উদ্যোগ। এর লক্ষ্য বইয়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠাভ্যাসকে জীবন্ত রাখা।
প্যারিসের পার্কগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ নীরবে বই পড়ছেন, কেউ অবসরের মুহূর্ত কাটাচ্ছেন প্রিয় লেখকের সঙ্গে। আবার অনেকেই বাসার আলমারিতে জায়গা না হওয়া বইগুলো এনে রেখে যান এই বাক্সে। দীর্ঘদিনের প্রিয় বই অন্য পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তাদের মুখে ফুটে ওঠে এক ধরনের তৃপ্তির হাসি—যেন নিজের মূল্যবান সম্পদ একজন যোগ্য উত্তরসূরীর কাছে হস্তান্তর করছেন।
ফরাসি সমাজে সন্তানরা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর স্বাধীনভাবে জীবনযাপন শুরু করে। ফলে অনেক প্রবীণের জীবনে বই হয়ে ওঠে একান্ত সঙ্গী। বইয়ের পাতায় তারা খুঁজে পান অতীতের স্মৃতি, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুত্ব কিংবা জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলো। পাঠ তাদের একাকিত্ব দূর করে এবং মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।
ফ্রান্সে বই কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পার্কে, নদীর তীরে, ট্রেনে কিংবা শহরের ব্যস্ততম স্থানে বই হাতে মানুষ দেখা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকাও একসঙ্গে বই পড়েন, আলোচনা করেন গল্প কিংবা চরিত্র নিয়ে। ফলে বই হয়ে ওঠে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের একটি অনন্য মাধ্যম।
এই পাঠসংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে ওঠে ছোটবেলা থেকেই। দেশটির পাবলিক লাইব্রেরি বা ‘বিবলিওথেক’ সবার জন্য উন্মুক্ত। পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক ‘মিডিয়াথেক’, যেখানে পাঠকরা অনলাইনে বই পড়ার সুযোগও পান। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের নিয়মিত পদচারণায় মুখর থাকে এসব পাঠাগার।
ফরাসিদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও বইয়ের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। বরং সমাজে জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে বই এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্যারিসের পার্কে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বইয়ের বাক্সগুলো তাই নিছক কাঠের কাঠামো নয়; এগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞানের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার এক নীরব বিপ্লব।
Comment / Reply From
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!