Dark Mode
Image
  • Thursday, 15 October 2026
সুপার এল নিনোর তাপে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা

সুপার এল নিনোর তাপে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা

প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর প্রভাবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জলবায়ুবিষয়ক গবেষকেরা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার উষ্ণ এবং তুলনামূলক দরিদ্র অঞ্চলগুলো।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ২৩ সেপ্টেম্বর এ পূর্বাভাসের খবর প্রকাশ করে। গবেষণাটির সহলেখক মাইকেল গ্রিনস্টোন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা।

গবেষকদের এই হিসাবটি নিশ্চিত মৃত্যুসংখ্যা নয়, বরং সম্ভাব্য অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস। গার্ডিয়ানের সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী, হিসাবের সময়কাল জুন ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত। তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চ হার এরপরও জুন বা জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রেকর্ড ভাঙছে এল নিনো

প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে যে প্রাকৃতিক জলবায়ুগত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাকে বলা হয় এল নিনো। এর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, খরা এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরন বদলে যেতে পারে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেই বর্তমান এল নিনো আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড অতিক্রম করেছে বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই এমন রেকর্ড ভাঙায় বিজ্ঞানীরা ঘটনাটির তীব্রতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ একে ‘গডজিলা-পর্যায়ের’ এল নিনো বলেও বর্ণনা করছেন।

এল নিনো নিজেই একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। তবে মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা আগে থেকেই বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কোন দেশগুলো?

গবেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকবে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে। দেশটিতে অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ সুদানেও অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, আগে থেকেই উষ্ণ আবহাওয়ায় বসবাসকারী মানুষ, বিশেষ করে যাঁদের পর্যাপ্ত শীতাতপনিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ পানির সরবরাহ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সীমিত, তাঁরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবেন। তীব্র গরমের সময় বাইরে কাজ করা শ্রমিক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।

ভবিষ্যতের জলবায়ুর আগাম সতর্কবার্তা

গবেষকদের মতে, বর্তমান এল নিনোর প্রভাবে তৈরি হতে পারে এমন তাপমাত্রা আগামী দুই দশকের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও সাধারণ হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের জলবায়ুর একটি আগাম ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

গবেষণাটির সহলেখক তাম্মা কার্লেটন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গবেষক। তাঁর মতে, এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে চলতি বছর বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তবে ভবিষ্যতে যখন এ ধরনের চরম তাপমাত্রা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, তখন শুধু জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

তাই তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস, সতর্কবার্তা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা আগে থেকেই তৈরি ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

কীভাবে কমানো যেতে পারে মৃত্যুঝুঁকি?

গবেষকেরা মনে করছেন, সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া গেলে পূর্বাভাসে উঠে আসা মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব। এ জন্য কয়েকটি ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। এতে মানুষ প্রয়োজনীয় সতর্কতা নিতে পারবেন এবং কর্তৃপক্ষও আগাম প্রস্তুতি নিতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড গরমের সময় মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জন্য শীতল ও নিরাপদ স্থান বা কুলিং সেন্টার চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালগুলোর জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত বিরতি, ছায়া ও পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

গবেষণাটির উদ্দেশ্য শুধু সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা তুলে ধরা নয়; বরং কোন অঞ্চলগুলো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তা আগেই চিহ্নিত করে সেখানে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।

খাদ্যসংকটও বাড়াতে পারে এল নিনো

তীব্র গরমের পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে খরা, দাবানল, বন্যা এবং পানির সংকটও দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে খাদ্য সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) আগস্টে সতর্ক করেছিল, এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন এবং খাদ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে।

ইতিহাসেও এল নিনোর ভয়াবহ প্রভাবের নজির রয়েছে। ১৮৭৭-৭৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খরা ও দুর্ভিক্ষে ৫ কোটির বেশি মানুষের মৃত্যুর হিসাব কিছু ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ভারত, ব্রাজিল ও চীন তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর মধ্যে ছিল। তবে অতীতের ওই মৃত্যুসংখ্যা বর্তমান পরিস্থিতির পূর্বাভাসের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয় নয়।

জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে বিপদের মাত্রা

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটোর মতে, বর্তমান এল নিনো এমন একটি জলবায়ুব্যবস্থার মধ্যে ঘটছে, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে আগেই অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে এবং পৃথিবীর তাপমাত্রাও দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উষ্ণ পরিবেশে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটলে চরম তাপপ্রবাহ, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও পানির সংকট মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে প্রতিটি শক্তিশালী এল নিনো আরও উষ্ণ পৃথিবীর ওপর প্রভাব ফেলবে।

পূর্বাভাসকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার সময়

৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাসটি গবেষকদের একটি হিসাব, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। গবেষণাটিতে বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত মৃত্যুর মধ্যকার মাসভিত্তিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে তার সঙ্গে এল নিনোর তাপমাত্রার পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখা হয়েছে। তুলনার ভিত্তি হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় গবেষণাটি সমমর্যাদার বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার জন্য বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ফলে পূর্বাভাসটিকে গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে পূর্বাভাসের অনিশ্চয়তা মানে ঝুঁকিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং কোন অঞ্চলগুলো বেশি বিপদের মুখে রয়েছে, তা আগে থেকে চিহ্নিত করা গেলে সেখানকার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

এল নিনোর তীব্রতা হয়তো প্রাকৃতিকভাবে কমে আসবে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে যাবে। তাই এখনকার প্রস্তুতি শুধু চলতি বছরের সম্ভাব্য প্রাণহানি কমানোর জন্য নয়, ভবিষ্যতের আরও উষ্ণ পৃথিবীতে মানুষের জীবন সুরক্ষিত রাখার জন্যও জরুরি।

Comment / Reply From