দেরি করতেই এআই বসের ‘ছাঁটাই’!
অফিসে দেরি করে আসার কারণে সাধারণত মানব ম্যানেজারের কাছ থেকেই সতর্কবার্তা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় কর্মীদের। কিন্তু এবার সেই সিদ্ধান্তই নিয়েছে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ম্যানেজার। যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত একটি দোকানে এমনই অভিনব ঘটনা ঘটেছে, যা ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
২৩ শিফটের মধ্যে ১৭ দিনই দেরি
ঘটনাটি ঘটেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যান্ডন ল্যাবসের পরীক্ষামূলক দোকান ‘অ্যান্ডন মার্কেট’-এ। সেখানে ‘লুনা’ নামের একটি এআই ম্যানেজার ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি কর্মীদের কাজের বিষয়ও তদারকি করছিল।
দোকানের এক কর্মী ২৩টি শিফটের মধ্যে ১৭ দিন দেরিতে কাজে যোগ দেন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত লুনার নজরে আসে। কর্মীর উপস্থিতির তথ্য ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নীতিমালা পর্যালোচনা করে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করে এআই ম্যানেজারটি।
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি লুনা নিজে। এআইয়ের সুপারিশ পর্যালোচনা করার পর অ্যান্ডন ল্যাবসের মানব কর্মকর্তারাই কর্মীটির ছাঁটাই কার্যকর করেন।
নিজের নিয়মই ভুলে গিয়েছিল এআই
ঘটনার আরও interesting দিক হলো, লুনা কয়েক মাস আগেই কর্মীদের উপস্থিতি ও কাজের বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নিয়মটি তার কার্যকর স্মৃতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আর সক্রিয় ছিল না।
ফলে কর্মীটি নিয়মিত দেরি করে এলেও দীর্ঘ সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে গবেষকেরা লুনাকে তার তৈরি করা নিয়মগুলো খুঁজে বের করতে বলেন এবং ওই কর্মীর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের নির্দেশ দেন। এরপরই পরিস্থিতি বদলে যায়।
নিজের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী কর্মীর উপস্থিতির রেকর্ড বিশ্লেষণ করে লুনা তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে।
আসলে কী পরীক্ষা করছে অ্যান্ডন ল্যাবস?
মানুষ ছাড়া একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতটা বাস্তব ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে, সেটিই পরীক্ষা করছে অ্যান্ডন ল্যাবস। এই উদ্দেশ্যে ‘অ্যান্ডন মার্কেট’ চালু করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে লুনার হাতে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ মার্কিন ডলারের তহবিল, একটি করপোরেট কার্ড, ইন্টারনেট সংযোগ এবং দোকান পরিচালনার জন্য তিন বছরের লিজ।
দোকান চালুর পর পণ্য নির্বাচন, দাম নির্ধারণ, কর্মীদের ব্যবস্থাপনা, দোকান খোলা ও বন্ধের সময় নির্ধারণসহ ব্যবসার নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এআই ম্যানেজারটিকে।
দোকানে বই থেকে মোমবাতি—সবই বিক্রি হয়
অ্যান্ডন মার্কেটে বই, মোমবাতি, আর্টওয়ার্ক ও বিভিন্ন ধরনের গেম বিক্রি করা হয়। এমনকি দোকানের তাকেও রাখা হয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক ও কল্পবিজ্ঞানধর্মী বেশ কিছু বিখ্যাত বই।
এর মধ্যে রয়েছে নিক বোস্ট্রমের ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ এবং অ্যালডাস হাক্সলির ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’। এআই পরিচালিত একটি দোকানের পণ্যতালিকায় এমন বই থাকাও বেশ প্রতীকী বলে মনে করছেন অনেকে।
এখনো লাভের মুখ দেখেনি এআই বস
তবে ব্যবসা পরিচালনায় লুনার সাফল্য এখনো খুব উজ্জ্বল নয়। পরীক্ষার শুরুতে দেওয়া ১ লাখ ডলারের তহবিল কয়েক মাসের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে শুধু কর্মী ব্যবস্থাপনাই নয়, বাস্তব ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অ্যান্ডন ল্যাবসের প্রধান নির্বাহী লুকাস পিটারসনের মতে, এআই ভবিষ্যতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে সক্ষম হলেও বাস্তব জগতের বিভিন্ন জটিলতা সামলানোর ক্ষেত্রে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
মানুষের চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব কতটা?
লুনার এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী নিয়োগ, মূল্যায়ন কিংবা ছাঁটাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যদি ধীরে ধীরে এআইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কর্মীদের অধিকার ও সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন আলোচনা প্রয়োজন হবে।
এই ঘটনা একই সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান এআই সিস্টেমগুলো অনেক জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারলেও দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের তৈরি নীতি ধারাবাহিকভাবে মনে রাখা ও প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে এখনও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কর্মক্ষেত্রে এআই এখন আর শুধু সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। ব্যবসা পরিচালনা থেকে শুরু করে কর্মী ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তার ব্যবহার শুরু হয়েছে। আর সেই বাস্তবতার একটি অদ্ভুত উদাহরণ হয়ে থাকল ‘লুনা’র হাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের এই ঘটনা।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!