ইউরোপে সবচেয়ে চাপে গ্রিসের কর্মীরা
কাজের দায়িত্ব, সময়মতো লক্ষ্য পূরণের চাপ কিংবা কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণের তাগিদ—সব মিলিয়ে মানসিক চাপ অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ইউরোপের সব দেশের কর্মীদের অভিজ্ঞতা এক নয়। কোথাও কর্মীদের বড় অংশ আগের দিনের উল্লেখযোগ্য সময় মানসিক চাপে থাকার কথা জানিয়েছেন, আবার কোথাও এই হার তুলনামূলক কম।
গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্যালাপের ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২৬’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কর্মীদের মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা এবং সার্বিক সুস্থতার চিত্র। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে গ্রিসের কর্মীদের দৈনিক মানসিক চাপ অনুভবের হার সবচেয়ে বেশি।
মানসিক চাপে এগিয়ে গ্রিস, এরপর মাল্টা
গ্যালাপের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিসের ৬১ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, আগের দিন তাঁরা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মানসিক চাপ অনুভব করেছেন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ। তালিকায় এরপর রয়েছে মাল্টা, যেখানে হার ৫৭ শতাংশ। সাইপ্রাসে ৫৬ শতাংশ, ইতালিতে ৫১ শতাংশ এবং স্পেনে ৪৭ শতাংশ কর্মী একই ধরনের চাপ অনুভবের কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, ডেনমার্কের কর্মীদের মধ্যে এই হার তুলনামূলক কম—১৯ শতাংশ। পোল্যান্ডে ২২ শতাংশ এবং লিথুয়ানিয়ায় ২৩ শতাংশ।
তবে প্রতিবেদনে ব্যবহৃত দৈনিক মানসিক চাপের সূচকটি কর্মীদের আগের দিনের চাপ অনুভবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। তাই এই পরিসংখ্যানকে শুধু অফিসের কাজের চাপের পরিমাপ হিসেবে দেখা ঠিক নয়; ব্যক্তিগত জীবনসহ নানা বিষয়ও মানুষের মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কাজের প্রতি আগ্রহ কমছে ইউরোপে
প্রতিবেদনে ইউরোপের কর্মক্ষেত্র নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের সম্পৃক্ততার হার টানা ষষ্ঠ বছরের মতো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে কম রয়েছে ইউরোপে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কর্মীদের সম্পৃক্ততার হার ২০ শতাংশে নেমেছে, যা ২০২০ সালের পর সর্বনিম্ন। ইউরোপে এই হার আরও কম—মাত্র ১২ শতাংশ।
ইউরোপের মধ্যে ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডে কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ততার হার সবচেয়ে কম, উভয় দেশেই ৭ শতাংশ। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে এ হার ৮ শতাংশ করে। লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রিয়ায় তা ৯ শতাংশ।
বিপরীতে, আলবেনিয়ায় কর্মীদের সম্পৃক্ততার হার ৩২ শতাংশ এবং রোমানিয়ায় ৩১ শতাংশ।
কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা বলতে শুধু অফিসে উপস্থিত থাকা বা নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করাকে বোঝায় না। বরং নিজের কাজের প্রতি আগ্রহ, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং দায়িত্ব পালনে মানসিকভাবে যুক্ত থাকার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।
কর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেললেও চাকরি ছেড়ে দেন না। কাজের ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করলেও অতিরিক্ত উদ্যোগ বা সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা অনেক সময় ‘কোয়ায়েট কুইটিং’ নামে পরিচিত।
কারা বেশি চাপ অনুভব করছেন?
গ্যালাপের প্রতিবেদনে কর্মীদের বয়স, দায়িত্ব ও কাজের ধরন অনুযায়ী মানসিক চাপ ও সম্পৃক্ততার পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ব্যবস্থাপক, ৩৫ বছরের কম বয়সী কর্মী এবং হাইব্রিড পদ্ধতিতে কাজ করা ব্যক্তিদের মধ্যে দৈনিক মানসিক চাপ অনুভবের হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে কম সম্পৃক্ত কর্মীদের মধ্যে তরুণ, ব্যবস্থাপক নন এমন কর্মী এবং যাঁদের দূর থেকে কাজ করার সুযোগ নেই, তাঁদের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
এ থেকে বোঝা যায়, কর্মীদের মানসিক চাপ কিংবা কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। কাজের পরিবেশ, দায়িত্বের ধরন, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও কর্মক্ষেত্রে সহায়তার সুযোগ—বিভিন্ন বিষয় এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
সার্বিক সুস্থতায় ইউরোপের অবস্থান ইতিবাচক
কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ততার হার কম হলেও জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক মূল্যায়নের সূচকে ইউরোপের চিত্র তুলনামূলক ভালো। গ্যালাপের প্রতিবেদনে ইউরোপের ৪৯ শতাংশ কর্মী নিজেদের জীবনকে ভালো অবস্থায় রয়েছে বলে মূল্যায়ন করেছেন। বৈশ্বিক গড় এ ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ।
এই সূচকে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ড শীর্ষে রয়েছে, যেখানে ৮১ শতাংশ কর্মী নিজেদের জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। আইসল্যান্ড ও ডেনমার্কে এ হার ৭৮ শতাংশ করে।
চাকরির বাজার সম্পর্কেও ইউরোপের কর্মীদের একটি বড় অংশ আশাবাদী। অঞ্চলটির ৫৭ শতাংশ কর্মী মনে করেন, তাঁদের বসবাসের এলাকায় বর্তমান সময় চাকরি খোঁজার জন্য ভালো।
দেশভেদে অবশ্য এই চিত্রে পার্থক্য রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে ৮৬ শতাংশ কর্মী চাকরি খোঁজার সময়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে, স্লোভাকিয়ায় এই হার ৩২ শতাংশ।
কর্মীদের অনাগ্রহ অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে
কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা কমে গেলে শুধু প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশই প্রভাবিত হয় না, উৎপাদনশীলতা ও কর্মী ধরে রাখার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। কর্মীরা কাজের প্রতি আগ্রহ হারালে নতুন উদ্যোগ নেওয়া, দক্ষতা কাজে লাগানো কিংবা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে বাড়তি ভূমিকা রাখার প্রবণতা কমতে পারে।
গ্যালাপের হিসাব অনুযায়ী, কর্মীদের কম সম্পৃক্ততার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
প্রতিবেদনের ফলাফল থেকে স্পষ্ট, কর্মীদের শুধু মানসিক চাপ কমানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের কাজের প্রতি আগ্রহ, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং সামগ্রিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, একটি কর্মক্ষেত্রের সাফল্য শুধু কর্মঘণ্টা বা কাজের পরিমাণ দিয়ে নয়, কর্মীরা কতটা সুস্থ, আগ্রহী ও সম্পৃক্ত—সেটির ওপরও নির্ভর করে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!