বালিশের পাশে ফোন? ঘুম ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু স্ক্রল করা, মেসেজের উত্তর দেওয়া কিংবা সকালে অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য মোবাইল ফোন বালিশের পাশে রেখে ঘুমানো—এখন অনেকেরই দৈনন্দিন অভ্যাস। কেউ কেউ আবার রাতভর ফোন চার্জে লাগিয়ে রাখেন বিছানার ওপর কিংবা বালিশের কাছেই। কিন্তু এই অভ্যাস ঘুমের মান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনের আলো, একের পর এক নোটিফিকেশন এবং ফোন ব্যবহারের অভ্যাস রাতের স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত করতে পারে। অন্যদিকে, বালিশ বা কম্বলের নিচে ফোন চার্জে রাখলে অতিরিক্ত তাপ জমে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই রাতে ফোন কোথায় রাখছেন এবং কীভাবে ব্যবহার করছেন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
১. স্ক্রিনের আলো ব্যাহত করতে পারে ঘুম
মানবদেহের একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি রয়েছে, যা কখন ঘুমাতে হবে এবং কখন জেগে থাকতে হবে, তা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে মেলাটোনিন নামের হরমোন জড়িত। সন্ধ্যার পর আলো কমতে থাকলে শরীর সাধারণত ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে।
কিন্তু রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইলের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে স্ক্রিন থেকে আসা নীল আলো মেলাটোনিন নিঃসরণ ও ঘুম আসার সময়কে প্রভাবিত করতে পারে।
শুধু আলোই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও, অনলাইন গেম কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ খবরও মস্তিষ্ককে দীর্ঘ সময় সজাগ রাখতে পারে। ফলে বিছানায় যাওয়ার পরও ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
এ সমস্যা কমাতে ঘুমানোর অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করুন। স্ক্রিনের নাইট মোড ও উজ্জ্বলতা কমানোর সুবিধা কাজে লাগাতে পারেন, তবে এগুলো ফোন ব্যবহারের সময় কমানোর বিকল্প নয়।
২. নোটিফিকেশনে ব্যাহত হতে পারে নিরবচ্ছিন্ন ঘুম
ফোন সাইলেন্ট থাকলেও নোটিফিকেশনের আলো, কম্পন কিংবা হঠাৎ বেজে ওঠা শব্দ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অনেক সময় অল্প সময়ের জন্য ঘুম ভেঙে গেলেও সকালে তা মনে থাকে না। তবে বারবার ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে পরদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মেসেজ বা কলের শব্দ শুনে ফোন হাতে নেওয়ার অভ্যাস থাকলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় জেগে থাকতে পারেন। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন কিছু দেখার আগ্রহ ঘুমের সময় আরও পিছিয়ে দিতে পারে।
এ সমস্যা এড়াতে রাতে ফোনে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোড চালু রাখতে পারেন। জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন থাকলে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নম্বরের কল আসার সুবিধা চালু রাখা যায়।
ফোনটি বালিশের পাশে না রেখে বিছানা থেকে কিছুটা দূরে টেবিলে রাখুন। এতে ঘুমের মধ্যে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
৩. মোবাইলের বিকিরণ নিয়ে কতটা উদ্বেগের কারণ আছে?
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। রাতে ফোন মাথার পাশে রাখলেই ক্যানসার বা অন্য কোনো গুরুতর রোগ হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তবে মোবাইল ফোনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। তাই বিকিরণ নিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করাই যুক্তিযুক্ত।
ঘুমের সময় ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখা যেতে পারে। রাতে ফোনের সংযোগ প্রয়োজন না হলে এয়ারপ্লেন মোড ব্যবহার করাও একটি বিকল্প। তবে ঘুমের ওপর ফোনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে রাত জেগে স্ক্রিন ব্যবহার, নোটিফিকেশন এবং ঘুমের সময় কমে যাওয়া।
৪. বালিশের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া বিপজ্জনক কেন?
রাতে ফোন বালিশের নিচে, কম্বলের ভেতরে কিংবা তোশকের ওপর রেখে চার্জ দেওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত। চার্জ হওয়ার সময় ফোন ও চার্জারের কিছুটা তাপ উৎপন্ন হয়। নরম কাপড় বা বিছানার চাদরে ফোন ঢাকা থাকলে সেই তাপ সহজে বের হতে পারে না। ফলে ডিভাইস অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত তাপের কারণে ব্যাটারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, আগুন লাগা কিংবা অন্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নিম্নমানের বা ক্ষতিগ্রস্ত চার্জার, ছেঁড়া কেবল এবং নষ্ট ব্যাটারি এ ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
তাই ফোন চার্জ দেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন—
-
বালিশ, কম্বল, তোশক বা অন্য কোনো নরম জিনিসের নিচে ফোন রেখে চার্জ দেবেন না।
-
ফোন ও চার্জার শক্ত, সমতল এবং ভালোভাবে বাতাস চলাচল করতে পারে—এমন স্থানে রাখুন।
-
ফোনের জন্য উপযুক্ত ও মানসম্মত চার্জার এবং অক্ষত কেবল ব্যবহার করুন।
-
ফোন বা ব্যাটারি অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেলে চার্জ বন্ধ করে সমস্যাটি পরীক্ষা করান।
ফোনটি চার্জ দেওয়ার সময় বিছানা থেকে দূরে কোনো টেবিলে রাখা ভালো। তবে চার্জ সম্পূর্ণ হলেই যে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে প্লাগ খুলতে হবে, তা সব ফোনের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়; নির্মাতার নির্দেশনা অনুসরণ করাই উত্তম।
রাতে ফোন কোথায় রাখবেন?
ঘুমের সময় ফোন বালিশের পাশে রাখতেই হবে, এমন কোনো প্রয়োজন নেই। সকালে অ্যালার্মের জন্য ফোন ব্যবহার করলে সেটি বিছানা থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ জায়গায় রাখতে পারেন। এতে অ্যালার্ম শোনা যাবে, আবার ঘুমের মধ্যে বারবার ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতাও কমবে।
ঘুমানোর আগে ফোনের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে স্ক্রিন ব্যবহার থামানো এবং নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখাও সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি শোবার ঘরে আলো ও শব্দ কমিয়ে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করুন।
সব মিলিয়ে, বালিশের পাশে মোবাইল থাকলেই যে শরীরের বড় কোনো ক্ষতি হবে, এমন নয়। তবে রাতে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে, আর বিছানায় ফোন চার্জ দেওয়া এড়িয়ে চলা জরুরি নিরাপত্তার অংশ। তাই সুস্থ ঘুম ও নিরাপদ রাতের জন্য ফোন ব্যবহারে সচেতন হোন এবং ঘুমের সময় সেটিকে বিছানা থেকে দূরে রাখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!