ঘুম হচ্ছে না? কখন চিকিৎসা জরুরি
সারাদিন কাজের চাপ, নানা দুশ্চিন্তা কিংবা অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসতে চায় না অনেকের। কখনো বারবার ঘুম ভেঙে যায়, আবার কখনো ভোর হওয়ার আগেই ঘুম শেষ হয়ে যায়। সকালে উঠে শরীর ক্লান্ত লাগে, কাজে মন বসে না, মেজাজও থাকে খিটখিটে।
মাঝেমধ্যে এমন সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে তা দৈনন্দিন জীবন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যাও অনিদ্রার কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের (এনএইচএলবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ঘুমানোর যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঘুম আসতে, ঘুম ধরে রাখতে কিংবা ভালো মানের ঘুম পেতে সমস্যা হলে তাকে অনিদ্রা বলা হয়। ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন এনে অনেক ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া যায়। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। <Cite refs={["turn832469search0","turn832469search4"]}/>
কেন রাতে ঘুম আসে না?
অনিদ্রার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। কারণটি চিহ্নিত করা গেলে উপযুক্ত সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা: কাজ, পড়াশোনা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত করতে পারে। রাতে বিছানায় যাওয়ার পর দিনের ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকলেও ঘুম আসতে দেরি হয়।
অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস: প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো কিংবা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করা রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্যাফেইন, নিকোটিন ও অ্যালকোহল: সন্ধ্যার পর চা, কফি বা এনার্জি ড্রিংক পান করলে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। নিকোটিনও উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। অ্যালকোহল প্রথমে তন্দ্রা আনলেও পরে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে পারে।
ওষুধের প্রভাব: কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, সর্দি-কাশি বা অ্যালার্জির ওষুধ এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট ওষুধ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। নিয়মিত কোনো ওষুধ খাওয়ার পর ঘুমের সমস্যা শুরু হলে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করুন।
শারীরিক অসুস্থতা: দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অ্যাজমা, অ্যাসিড রিফ্লাক্স, ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন কিংবা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যাও রাতের ঘুম ব্যাহত করতে পারে। উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সঙ্গেও অনিদ্রার সম্পর্ক রয়েছে। <Cite refs={["turn832469search0","turn832469search3","turn832469search7"]}/>
ঘুম ভালো করতে যে অভ্যাসগুলো কাজে আসতে পারে
১. ঘুম ও জাগার সময় নির্দিষ্ট রাখুন
প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ছুটির দিনেও এই রুটিন বজায় রাখলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ ঠিক রাখতে সুবিধা হয়।
ঘুম না এলেও বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় অস্থির হয়ে থাকার বদলে কিছুক্ষণ শান্ত কোনো কাজে মন দিতে পারেন। ঘুম ঘুম ভাব এলে আবার বিছানায় ফিরুন।
২. ঘুমানোর আগে ফোন ব্যবহার কমান
ফোন, ট্যাবলেট ও কম্পিউটারের পর্দার আলো এবং উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট ঘুমের প্রস্তুতিতে বাধা দিতে পারে। তাই ঘুমানোর আগে অন্তত এক ঘণ্টা এসব ডিভাইস ব্যবহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন।
এর পরিবর্তে হালকা বই পড়া, শান্ত সংগীত শোনা কিংবা পরের দিনের কাজের তালিকা লিখে রাখার মতো অভ্যাস তৈরি করতে পারেন। ঘুমানোর ঘরটি অন্ধকার, শান্ত ও আরামদায়ক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। <Cite refs={["turn832469search2","turn832469search3"]}/>
৩. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন
ঘুমানোর আগে দুশ্চিন্তা বেড়ে গেলে শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া কিছু মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে। ধীরে শ্বাস নিন এবং স্বাভাবিক ছন্দে ধীরে ছাড়ুন। প্রতিটি শ্বাসের সময় মনে মনে গুনতে পারেন।
এভাবে কয়েক মিনিট অনুশীলন করলে মনোযোগ বারবার ঘুরে যাওয়া চিন্তা থেকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা সহজ হতে পারে। তবে শ্বাস ধরে রাখার কারণে অস্বস্তি হলে তা করবেন না।
৪. যোগনিদ্রা বা শিথিলায়নের চেষ্টা করুন
যোগনিদ্রায় শুয়ে থেকে নির্দেশনা অনুসরণ করে শরীরের বিভিন্ন অংশ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়। এটি শিথিল হওয়ার একটি পদ্ধতি, যা কারও কারও ঘুমের আগের অস্থিরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে যোগনিদ্রা সবার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অনিদ্রা দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শিথিলায়নের কৌশলের ওপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
৫. ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন
বাইরের শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে কানের উপযোগী ইয়ারপ্লাগ কিংবা নিরাপদ মাত্রার স্থির ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড ব্যবহার করে দেখতে পারেন। ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখুন এবং আলো যতটা সম্ভব কমিয়ে দিন।
ক্যাফেইন, নিকোটিন ও অ্যালকোহল ঘুমানোর সময়ের কাছাকাছি এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত দিনের বেলায় শরীরচর্চা করাও ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে তীব্র ব্যায়াম না করাই ভালো। <Cite refs={["turn832469search2","turn832469search10"]}/>
ভেষজ চা কিংবা ঘুমের ওষুধ কি সমাধান?
ক্যামোমিল বা ল্যাভেন্ডারের মতো ভেষজ চা পান করে কেউ কেউ আরাম অনুভব করেন। তবে এসব পানীয় অনিদ্রার নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা—এমন প্রমাণ সীমিত। ভেষজ উপাদানও কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করলে এ ধরনের পণ্য ব্যবহার করার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
মেলাটোনিন শরীরের স্বাভাবিকভাবে তৈরি একটি হরমোন, যা ঘুম-জাগরণের সময় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তবে মেলাটোনিন সবার জন্য উপযুক্ত নয় এবং সব ধরনের অনিদ্রার সমাধানও নয়।
একইভাবে, দোকানে পাওয়া কিছু ঘুমের ওষুধে ডাইফেনহাইড্রামিন বা ডক্সিলামিনের মতো অ্যান্টিহিস্টামিন থাকে। এগুলোর কারণে পরদিন ঝিমুনি, মাথা ঘোরা কিংবা অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। নিয়মিত বা দীর্ঘমেয়াদে নিজে থেকে এসব ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। <Cite refs={["turn832469search4","turn832469search6","turn832469search10"]}/>
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
ঘুমের অভ্যাস বদলানোর পরও সমস্যা না কমলে, কয়েক মাস ধরে ঘুমের অসুবিধা চলতে থাকলে কিংবা দিনের কাজ, পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা বলতে সাধারণত এমন সমস্যাকে বোঝায়, যা সপ্তাহে অন্তত তিন রাত হয় এবং তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে চলে। তবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে না। সমস্যা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে আগেই পরামর্শ নেওয়া উচিত। <Cite refs={["turn832469search1","turn832469search4"]}/>
বিশেষ করে নিচের পরিস্থিতিগুলো অবহেলা করবেন না—
-
দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি বা মনোযোগের সমস্যা হলে।
-
ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা, শ্বাস আটকে আসা বা হাঁসফাঁস করে জেগে ওঠার ঘটনা ঘটলে।
-
রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে গেলে।
-
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বস্তি, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সঙ্গে ঘুমের সমস্যা দেখা দিলে।
-
কোনো ওষুধ শুরু বা পরিবর্তন করার পর ঘুমের সমস্যা তৈরি হলে।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের রুটিন, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, ওষুধের ব্যবহার এবং অন্য কোনো ঘুমের রোগের সম্ভাবনা যাচাই করতে পারেন।
দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার চিকিৎসা কী?
দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে কেবল ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভর করাই একমাত্র পথ নয়। চিকিৎসকেরা রোগীর সমস্যার ধরন অনুযায়ী কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া বা CBT-I পরামর্শ দিতে পারেন।
এই চিকিৎসায় ঘুম সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা, ঘুমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং ঘুমের পরিবেশে পরিবর্তন আনার বিষয়ে কাজ করা হয়। এতে ঘুমের সময়সূচি ঠিক করা, বিছানাকে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত রাখা এবং শিথিলায়নের কৌশল শেখানোর মতো উপাদান থাকতে পারে।
এনএইচএলবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের নির্দেশনায় দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার জন্য CBT-I-কে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক ঝুঁকি ও উপকার বিবেচনা করে ওষুধও দিতে পারেন। <Cite refs={["turn832469search5","turn832469search11","turn832469search14"]}/>
ঘুমের সমস্যাকে অবহেলা নয়
মাঝেমধ্যে ঘুম না আসা মানেই গুরুতর রোগ নয়। তবে সমস্যা নিয়মিত হলে তার কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ক্যাফেইন কমানো, ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার সীমিত করা এবং শোবার ঘর শান্ত রাখা দিয়ে শুরু করতে পারেন।
এসব পরিবর্তনে কাজ না হলে কিংবা ঘুমের সমস্যা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কারণ দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রা শুধু ক্লান্তি নয়, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির সমস্যাও বাড়াতে পারে এবং কিছু দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ভালো ঘুমের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে অভ্যাস বদলানো; কিন্তু সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সঠিক চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!