Dark Mode
Image
  • Friday, 16 October 2026
দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, ঘর থেকেই শুরু

দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি, ঘর থেকেই শুরু

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প কিংবা অগ্নিকাণ্ড—দুর্যোগ মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন। কে কখন বিপদের মুখে পড়বেন, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে সচেতনতা, পরিকল্পনা ও সময়মতো ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলেই চলে না। ব্যক্তি, পরিবার, ভবনমালিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। নিজের বাড়ি কতটা নিরাপদ, জরুরি পরিস্থিতিতে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে কিংবা পরিবারের সদস্যদের কী করণীয়—এসব তথ্য আগে থেকেই জানা থাকলে বিপদের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।

আজ ১৩ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের উদ্যোগকে উৎসাহিত করাই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৯ সাল থেকে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘Resilience Starts at Home’, যার মূল বার্তা হলো দুর্যোগ সহনশীলতা গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হবে ঘর থেকেই। বাংলাদেশেও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘ঘর থেকে শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’। <Cite refs={["turn504405search5","turn504405search0","turn504405search13"]}/>

দুর্যোগ প্রতিরোধের চেয়ে ঝুঁকি কমানো জরুরি

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সব সময় ঠেকানো সম্ভব নয়। ভূমিকম্প বন্ধ করা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে দুর্যোগের ক্ষতি কতটা হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রস্তুতি, অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং মানুষের সচেতনতার ওপর।

যেমন, ভূমিকম্পের সময় একটি ভবন কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তার সঙ্গে নির্মাণের মান, নকশা ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে, ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকলে আগুন লাগার পর ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ বাড়ে।

তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা জরুরি। কোথায় বিপদের আশঙ্কা বেশি, কোন ভবন বা অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ এবং কারা জরুরি পরিস্থিতিতে বেশি অসহায় হয়ে পড়তে পারেন—এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

নিজের ঘর কতটা নিরাপদ, জানেন কি?

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত নিজের ঘর ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা সম্পর্কে জানা। বিশেষ করে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় ভবন নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড ও নিরাপত্তাবিধি মানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো বা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে যোগ্য প্রকৌশলীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও যন্ত্রপাতি নিয়মিত পরীক্ষা করা, দাহ্য পদার্থ নিরাপদে রাখা এবং জরুরি বহির্গমনপথ বাধামুক্ত রাখা দরকার। ভবনের বাসিন্দাদেরও জানতে হবে আগুন লাগলে কোন পথে বের হতে হবে এবং কোথায় নিরাপদে জড়ো হতে হবে।

জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস বা অন্য কোনো সংযোগ বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে তা নিরাপদভাবে করার পদ্ধতি আগে থেকে জানা উচিত। বিপদের মুহূর্তে অপরিচিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

ভূমিকম্পে প্রস্তুতির বিকল্প নেই

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভূমিকম্পের ঝুঁকি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভূমিকম্প কখন, কোথায় এবং কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে জানানো সম্ভব নয়। এ কারণে প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বাড়ি ও কর্মস্থলে ভারী আসবাব এমনভাবে রাখা উচিত, যাতে তা সহজে উল্টে গিয়ে আঘাতের কারণ না হয়। জরুরি বহির্গমনপথ পরিষ্কার রাখা এবং পরিবারের সবাইকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নিয়ম জানানোও জরুরি।

ভূমিকম্পের সময় ঘরের ভেতরে থাকলে সাধারণ নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী নিচু হয়ে বসে শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং সেটি ধরে থাকতে হবে। জানালা, কাচ ও পড়ে যেতে পারে এমন ভারী বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। কম্পনের সময় তাড়াহুড়া করে সিঁড়ি দিয়ে নামা বা লিফট ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে।

শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা যথেষ্ট নয়। ভবন নির্মাণের মান নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা এবং নিয়মিত মহড়া আয়োজনের মতো উদ্যোগও প্রয়োজন।

বজ্রপাত, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়েও প্রয়োজন আগাম সতর্কতা

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, নদী অববাহিকায় বন্যা ও নদীভাঙন, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং দেশের নানা স্থানে বজ্রপাত মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

প্রতিটি দুর্যোগের ধরন আলাদা হওয়ায় প্রস্তুতিও হতে হবে পরিস্থিতি অনুযায়ী।

বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, জলাশয়, উঁচু বিচ্ছিন্ন গাছ এবং খোলা স্থানে থাকা বিপজ্জনক। নিরাপদ ভবন বা ছাউনিতে আশ্রয় নেওয়া জরুরি। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কতা জারি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আগেই নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে।

আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া এবং সেটি দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানো দুর্যোগে প্রাণহানি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তাই সরকারি সতর্কবার্তা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা এবং নির্ভরযোগ্য আবহাওয়ার তথ্যের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, নাগরিকেরও করণীয় আছে

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পরিকল্পিত উন্নয়ন, কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, উদ্ধার ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া—সবই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অংশ।

তবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ের প্রস্তুতিও সমান প্রয়োজনীয়। প্রতিটি পরিবার জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ করতে পারে, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি, শুকনো খাবার, টর্চলাইট, পাওয়ার ব্যাংক এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী দিয়ে একটি জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখতে পারে।

পরিবারে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা প্রতিবন্ধী সদস্য থাকলে তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও আগে থেকে করা উচিত। একইভাবে, স্থানীয় বাসিন্দারা একে অন্যকে সহায়তা করার জন্য যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন।

দুর্যোগের সময় গুজব ছড়ানো, যাচাই না করা তথ্য প্রচার করা কিংবা উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করাও ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সঠিক তথ্য জানা এবং তা দায়িত্বশীলভাবে প্রচার করা জরুরি।

দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ

দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলছে। ২০১৫ সালে জাপানের সান্দাই শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের তৃতীয় বিশ্ব দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সম্মেলনে গৃহীত হয় ‘সান্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন ২০১৫–২০৩০’।

এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের কারণে মানুষের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ক্ষতি কমানো। এজন্য দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানো, কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা, ঝুঁকি হ্রাসে বিনিয়োগ করা এবং দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি ও পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। <Cite refs={["turn504405search2","turn504405search8"]}/>

সান্দাই ফ্রেমওয়ার্কে সাতটি বৈশ্বিক লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কমানো, অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও মৌলিক সেবা সচল রাখা, জাতীয় ও স্থানীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের কৌশল শক্তিশালী করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং মানুষের কাছে আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া। <Cite refs={["turn504405search3","turn504405search4"]}/>

এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নও প্রয়োজন। উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের সময় সম্ভাব্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। নদী, হাওর, উপকূল, বন, পাহাড় কিংবা জলাভূমিতে অবকাঠামো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব ও দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় প্রস্তুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বাড়ছে। অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, উপকূলীয় ঝুঁকি ও অন্যান্য আবহাওয়াসংক্রান্ত বিপদের প্রভাব মানুষের জীবনযাত্রা এবং অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের মতো দুর্যোগ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদ সড়ক ও সেতু, কার্যকর নিষ্কাশনব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নির্ভরযোগ্য আগাম সতর্কবার্তা—এসব উদ্যোগে গুরুত্ব দিতে হবে।

পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। উন্নয়নের নামে জলাধার ভরাট, প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা নষ্ট করা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে বিপদের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার শুরু হোক আজই

দুর্যোগ সব সময় আগে থেকে অনুমতি নিয়ে আসে না। কিন্তু বিপদের আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আমাদের রয়েছে। নিজের বাড়ি ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা যাচাই করা, জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় শেখা, আগাম সতর্কবার্তা অনুসরণ করা এবং পরিবারের সদস্যদের প্রস্তুত রাখা—এসব ছোট উদ্যোগও বড় বিপদের সময় কাজে আসতে পারে।

একই সঙ্গে নিরাপদ অবকাঠামো, পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সরকার—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের বার্তাও তাই স্পষ্ট: দুর্যোগের পর নয়, প্রস্তুতি শুরু করতে হবে দুর্যোগের আগেই—আর সেই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হতে পারে নিজের ঘর থেকেই।

Comment / Reply From