হারিয়ে যেতে বসা হীরামনের দেখা
একসময় দেশের গ্রাম-গঞ্জের গাছপালায় প্রায়ই দেখা মিলত হীরামন বা ফুলমাথা টিয়া পাখির। রঙিন এই পাখি ছিল চেনা প্রকৃতিরই একটি অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে খাদ্যের সংকট ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় আগের মতো আর দেখা মেলে না এর। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি হীরামন পাখির দেখা মিলেছে। পাখিটির ছবি তুলেছেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক ড. তুহিন ওয়াদুদ।
কামরাঙাগাছেই ছিল প্রিয় ঠিকানা
হীরামন পাখির পছন্দের খাবারের মধ্যে রয়েছে দেশীয় ফল কামরাঙা। একসময় গ্রামের পাশাপাশি শহরের বাড়ির আঙিনায় থাকা কামরাঙাগাছেও এই পাখির আনাগোনা চোখে পড়ত।
কামরাঙাগাছ ও হীরামনের শরীরের রঙে কিছুটা মিল থাকায় পাতার আড়ালে বসে থাকা পাখিটিকে অনেক সময় খুঁজে পাওয়াও কঠিন হতো। কিন্তু এখন বাড়িঘর ও পরিবেশের পরিবর্তনের পাশাপাশি ফলের গাছ কমে যাওয়ায় পাখিটির বিচরণও আগের তুলনায় অনেক কমেছে।
পুরুষ ও স্ত্রী পাখির রঙে পার্থক্য
হীরামন পাখির পুরুষ ও স্ত্রী পাখির চেহারায় বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুরুষ পাখির মাথার পেছনে মুকুটের মতো একটি অংশ দেখা যায়। নাক ও গালের রং গোলাপি থেকে ফ্যাকাশে নীলের মধ্যে হতে পারে। গলায় থাকে সরু কালো কলার, আর চিবুকে দেখা যায় কালো ডোরার মতো দাগ।
অন্যদিকে, স্ত্রী পাখির মাথার রং তুলনামূলকভাবে ফ্যাকাশে ধূসর। তার গলায় কালো কলার থাকলেও চিবুকের ডোরাকাটা দাগ দেখা যায় না।
অপরিণত হীরামন পাখির মাথা সাধারণত সবুজ ও চিবুক ধূসর রঙের হয়। তাদের কাঁধে থাকা লালচে প্যাচও থাকে না।
আকারে ছোট, দেখতে আকর্ষণীয়
হীরামন পাখি সাধারণত প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। লেজসহ এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
গাছের কোটর বা গর্তে এরা বাসা বাঁধে। একবারে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি সাদা ডিম দেয়।
প্রকৃতিতে গাছের ফলন ও নির্দিষ্ট আবাসস্থলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এ পাখির জীবনও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
গানের নামেও হীরামন
হীরামন পাখি শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেই পরিচিত নয়, বাংলা গানেও এর উপস্থিতি রয়েছে। জনপ্রিয় অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ফজলুর রহমান বাবু ‘হীরামন পাখি’ নামে একটি গান গেয়েছেন। গানটি শ্রোতাদের মধ্যেও বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কমছে দেখা মেলার সুযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জে দেখা পাওয়া হীরামনটির আলোকচিত্রী ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, একসময় উত্তরাঞ্চলের প্রায় সব জায়গাতেই এ পাখির দেখা পাওয়া যেত। এখন সেই চিত্র আর নেই।
তাঁর মতে, হীরামন পাখি গাছের ফল খেতে পছন্দ করে। কিন্তু ফলের গাছ কমে যাওয়া এবং উপযুক্ত আবাসস্থলের সংকটে ধীরে ধীরে পাখিটির সংখ্যাও কমছে।
প্রকৃতির এই সুন্দর পাখিটির সাম্প্রতিক দেখা মিললেও এর উপস্থিতি আগের মতো স্বাভাবিক নয়। তাই হীরামনের মতো দেশীয় পাখিদের টিকিয়ে রাখতে খাদ্যের উৎস ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!