Dark Mode
Image
  • Friday, 16 October 2026
ডেঙ্গু ঠেকাতে ঘরেই বদলান ৭ অভ্যাস

ডেঙ্গু ঠেকাতে ঘরেই বদলান ৭ অভ্যাস

বর্ষা বিদায় নিচ্ছে, প্রকৃতিতে এসেছে শরতের ছোঁয়া। তবে বৃষ্টির পানি জমে থাকা ছাদের কোণ, বারান্দার ফুলের টব কিংবা অব্যবহৃত পাত্র হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার প্রজননস্থল। ফলে বৃষ্টি কমে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা মারার ওষুধ ব্যবহার করলেই হবে না। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি সরানো, পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার মতো অভ্যাসও জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ অনুযায়ী, মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা এবং মশার কামড় এড়িয়ে চলা ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়। <Cite refs={["turn223205search6","turn223205search9"]}/>

১. সপ্তাহে এক দিন করুন ‘মশার প্রজননস্থল খোঁজার অভিযান’

ঘর পরিষ্কার করার সময় সাধারণত মেঝে, আসবাব কিংবা জানালার দিকে নজর দেওয়া হয়। কিন্তু ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে বাড়ির এমন কিছু জায়গাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন, যেখানে অল্প পানি জমে থাকতে পারে।

বারান্দার ফুলের টব, টবের নিচের পাত্র, ছাদের বালতি, পরিত্যক্ত বোতল, ভাঙা পাত্র, পুরোনো টায়ার কিংবা বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের সামগ্রী—সবই হতে পারে এডিস মশার বংশবিস্তারের সম্ভাব্য জায়গা।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বাড়ির ভেতরে ও বাইরে পানি জমতে পারে এমন পাত্র অন্তত সপ্তাহে একবার খালি করে ভালোভাবে পরিষ্কার করার পরামর্শ দেয়। প্রয়োজনীয় পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে, আর অপ্রয়োজনীয় পাত্র ফেলে দেওয়া বা উল্টে রাখা যেতে পারে।

তাই পরিবারের সবাই মিলে সপ্তাহের একটি দিন নির্ধারণ করুন। সেদিন বাড়ির প্রতিটি কোণ পরীক্ষা করে দেখুন, কোথাও পানি জমে আছে কি না। <Cite refs={["turn223205search1","turn223205search11"]}/>

২. ফুলের টব ও ছাদবাগানে রাখুন বাড়তি নজর

বারান্দা কিংবা ছাদবাগানের গাছ বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ায়। তবে গাছে পানি দেওয়ার পর টবের নিচের পাত্রে পানি জমে থাকলে সেটিও মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।

গাছে পানি দেওয়ার পর অতিরিক্ত পানি সরিয়ে ফেলুন। বৃষ্টির পর টবের নিচে পানি জমেছে কি না, তা পরীক্ষা করুন। ছাদে ড্রাম, বালতি কিংবা পানি রাখার অন্য পাত্র থাকলে সেগুলো ভালোভাবে ঢেকে রাখুন।

ঘরের ভেতরে ফুলদানিতে পানি রাখলেও নিয়মিত পানি পরিবর্তন ও পাত্র পরিষ্কার করুন। কারণ পাত্রের গায়ে মশার ডিম লেগে থাকতে পারে। শুধু পানি ফেলে দেওয়ার বদলে পাত্রের ভেতরের অংশও ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও মশা থেকে বাঁচুন

ডেঙ্গু নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, মশার কামড় থেকে বাঁচতে শুধু রাতে সতর্ক থাকলেই চলে। কিন্তু ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা দিনের বেলাতেও সক্রিয় থাকে।

তাই রাতে মশারি ব্যবহার করলেও দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। শিশুদের ঘুমানোর সময় প্রয়োজন অনুযায়ী মশারি ব্যবহার করুন। বাইরে গেলে শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরুন।

মশা প্রতিরোধক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। ডব্লিউএইচও ডিইইটি (DEET), পিকারিডিন (Picaridin) অথবা আইআর৩৫৩৫ (IR3535)-যুক্ত মশা প্রতিরোধকের কথা উল্লেখ করেছে। পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য বেছে নেওয়া প্রয়োজন। <Cite refs={["turn223205search6","turn223205search2"]}/>

৪. ঘরের ভেতরের আড়াল করা জায়গাগুলোও পরিষ্কার রাখুন

মশা শুধু বাড়ির বাইরে অবস্থান করে না। ঘরের অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গা, যেমন সিঙ্কের নিচে, আসবাবের আড়ালে, কাপড় রাখার জায়গা কিংবা কম আলো-বাতাস চলাচল করে এমন স্থানেও মশা আশ্রয় নিতে পারে।

তাই ঘর পরিষ্কারের সময় এসব জায়গায়ও নজর দিন। জানালা ও দরজায় মশা প্রবেশের সুযোগ থাকলে জাল লাগান এবং জাল ছেঁড়া থাকলে মেরামত করুন।

ঘরের ভেতরে ফুলদানি, পানির পাত্র কিংবা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানিও পরীক্ষা করুন। মনে রাখতে হবে, শুধু দৃশ্যমান মশা তাড়ালেই ঝুঁকি শেষ হয় না; বংশবিস্তারের জায়গা দূর করাও জরুরি। <Cite refs={["turn223205search1","turn223205search11"]}/>

৫. বৃষ্টির পর পাঁচ মিনিট সময় দিন বাড়ির চারপাশে

বৃষ্টি থামার পর বাড়ির আশপাশ একবার ঘুরে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন। ছাদে পানি জমেছে কি না, বারান্দার কোণে পানি আটকে আছে কি না, কোনো বোতল বা পাত্রে বৃষ্টির পানি জমেছে কি না—এসব পরীক্ষা করতে খুব বেশি সময় লাগে না।

বিশেষ করে নির্মাণাধীন বাড়ি, খালি প্লট ও পরিত্যক্ত জায়গায় পড়ে থাকা প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ার কিংবা নির্মাণসামগ্রীতে পানি জমতে পারে। বাড়ির আশপাশে এমন কিছু চোখে পড়লে নিরাপদভাবে পানি সরিয়ে ফেলুন এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান।

আবহাওয়ার পরিবর্তনও ডেঙ্গুর ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে। ২০২৬ সালে Nature Reviews Microbiology-তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে জলবায়ু পরিবর্তন, চরম আবহাওয়া ও আর্থসামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের বিস্তারের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তাই একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত সতর্ক থাকা প্রয়োজন। <Cite refs={["turn223205search0","turn223205search8"]}/>

৬. নিজের ঘরের পাশাপাশি প্রতিবেশীর পরিবেশও পরিচ্ছন্ন রাখুন

বাড়ির ভেতর পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। পাশের খালি জায়গা, ছাদ, ড্রেনের আশপাশ কিংবা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমে থাকলেও মশার বংশবিস্তার হতে পারে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিয়ে ২০২৬ সালে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতেও মানুষের সচেতনতা ও বাস্তব প্রতিরোধমূলক আচরণের মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি উঠে এসেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার গৃহিণীদের নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকলেও নিয়মিত প্রতিরোধমূলক অভ্যাস সবার মধ্যে গড়ে ওঠেনি। <Cite refs={["turn608010search3","turn608010search2"]}/>

তাই শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার করে দায়িত্ব শেষ না করে প্রতিবেশীদেরও সচেতন করুন। আবাসিক ভবনের ছাদ, পার্কিং এলাকা এবং যৌথ ব্যবহারের জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখার উদ্যোগ নিন। প্রয়োজনে বাড়ির মালিক সমিতি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিন।

৭. জ্বর হলে অবহেলা নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন

ডেঙ্গু হলে জ্বরের পাশাপাশি মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায় না।

বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন জ্বর কমতে শুরু করার পরও। এ সময় তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, নাক-মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। <Cite refs={["turn223205search6","turn223205search12"]}/>

ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী, ডেঙ্গু হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর বা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। <Cite refs={["turn223205search6","turn223205search9"]}/>

ছোট অভ্যাসেই শুরু হোক ডেঙ্গু প্রতিরোধ

ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সব সময় বড় কোনো উদ্যোগের অপেক্ষা করতে হয় না। সপ্তাহে এক দিন বাড়ির আশপাশ পরীক্ষা করা, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা, পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা এবং দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

তবে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা পরিষ্কার রাখার উদ্যোগও জরুরি।

শরতের এই পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় মনে রাখুন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু মশা মারার বিষয় নয়—মশার বংশবিস্তারের সুযোগ বন্ধ করা এবং নিয়মিত সতর্ক থাকাই এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

Comment / Reply From