Dark Mode
Image
  • Friday, 23 October 2026
জ্বর কমলেও ডেঙ্গুর বিপদ শেষ নয়

জ্বর কমলেও ডেঙ্গুর বিপদ শেষ নয়

 

ডেঙ্গুর যেসব লক্ষণ অবহেলা করলেই হতে পারে বিপদ

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে জ্বর, মাথাব্যথা কিংবা শরীরব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। অনেকেই এসব লক্ষণকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করেন। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বর কমে গেলেও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। এ সময় কিছু বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর এডিস মশা ভাইরাস বহন করতে পারে এবং পরে অন্য ব্যক্তিকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। বেশির ভাগ আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে উঠলেও কারও কারও ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ২০ জনে একজন গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন।

তাই ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ সম্পর্কে জানা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ কী কী?

সংক্রমিত মশার কামড়ের পর সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। তবে অনেকের সংক্রমণ হলেও কোনো উপসর্গ দেখা যায় না।

ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • হঠাৎ জ্বর আসা; কখনো তাপমাত্রা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে।

  • তীব্র মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা।

  • পেশি, হাড় ও গিঁটে ব্যথা।

  • বমি বমি ভাব বা বমি।

  • শরীরে লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া।

  • খাবারে অরুচি, দুর্বলতা এবং কখনো গ্রন্থি ফুলে যাওয়া।

শরীর ও হাড়ে তীব্র ব্যথার কারণে ডেঙ্গুকে অনেক সময় ‘হাড়ভাঙা জ্বর’ বলা হয়। সাধারণত উপসর্গ ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হতে পারে। অনেক রোগী প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হতে শুরু করেন। তবে সবার ক্ষেত্রে রোগের ধরন ও সুস্থ হওয়ার সময় এক নয়।

শিশুদের ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ খেয়াল রাখবেন

শিশুদের ডেঙ্গুর উপসর্গ অনেক সময় অন্য সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরের মতো মনে হতে পারে। তাই জ্বরের পাশাপাশি শিশুর আচরণ, খাবার গ্রহণ এবং প্রস্রাবের পরিমাণের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।

শিশুর মধ্যে অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, খিটখিটে মেজাজ, বারবার বমি, পেটব্যথা কিংবা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শিশু পানি বা তরল খাবার খেতে না পারলে, প্রস্রাব কমে গেলে কিংবা অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়লে অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে ছোট শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

জ্বর কমলেও কেন সতর্ক থাকতে হবে?

ডেঙ্গুর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো, জ্বর কমে যাওয়ার পরও গুরুতর জটিলতা শুরু হতে পারে। সাধারণত অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে রোগীর অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। জ্বর কমার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

এ সময় রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে গিয়ে শরীরে রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে শক, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

তাই জ্বর নেমে যাওয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ডেঙ্গুর যেসব বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন

নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

  • তীব্র পেটব্যথা: পেটে প্রচণ্ড ব্যথা বা স্পর্শ করলে ব্যথা বেড়ে যাওয়া।

  • বারবার বমি: ২৪ ঘণ্টায় অন্তত তিনবার বমি হওয়া কিংবা বারবার বমির কারণে তরল পান করতে না পারা।

  • রক্তপাত: নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া কিংবা পায়খানায় রক্ত দেখা।

  • অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অস্থিরতা: অস্বাভাবিক ঝিমুনি, অস্থিরতা কিংবা খিটখিটে আচরণ।

  • শ্বাসকষ্ট: দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

  • পানিশূন্যতা ও রক্তসঞ্চালনের সমস্যা: খুব কম প্রস্রাব, ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে ত্বক কিংবা অতিরিক্ত তৃষ্ণা।

  • সচেতনতার পরিবর্তন: বিভ্রান্তি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা খিঁচুনি।

এসব লক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গুর ইঙ্গিত হতে পারে। রোগীর জ্বর না থাকলেও এগুলো দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক।

ডেঙ্গু শনাক্ত করতে কোন পরীক্ষা করা হয়?

ডেঙ্গু শনাক্ত করার জন্য রোগীর উপসর্গ, অসুস্থতার কত দিন চলছে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসক পরিস্থিতি অনুযায়ী এক বা একাধিক পরীক্ষা দিতে পারেন।

এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা: অসুস্থতার প্রথম সাত দিনে এই পরীক্ষা বিশেষভাবে উপযোগী হতে পারে। ফল পজিটিভ হলে ডেঙ্গু সংক্রমণের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে নেগেটিভ ফল এলেই ডেঙ্গু নেই বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

আইজিএম অ্যান্টিবডি পরীক্ষা: সংক্রমণের কয়েক দিন পর শরীরে আইজিএম অ্যান্টিবডি শনাক্ত হতে পারে। সাধারণত উপসর্গ শুরুর প্রায় চতুর্থ বা পঞ্চম দিন থেকে এটি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। পরীক্ষার সময় ও ফলাফল চিকিৎসককে উপসর্গের সঙ্গে মিলিয়ে বিচার করতে হয়।

পিসিআর বা নিউক্লিক অ্যাসিড পরীক্ষা: অসুস্থতার প্রথম সাত দিনে রক্তে ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে এ পরীক্ষা করা যেতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

সিবিসি বা পূর্ণ রক্ত গণনা: রক্তের বিভিন্ন কণিকা, প্লাটিলেট ও হেমাটোক্রিটের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করতে এ পরীক্ষা ব্যবহৃত হয়। রোগীর অবস্থা মূল্যায়নে এসব ফল সহায়ক হলেও শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে রোগের তীব্রতা নির্ধারণ করা যায় না।

ডেঙ্গুর সন্দেহ থাকলে পরীক্ষার ফলের অপেক্ষায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করা উচিত নয়।

ডেঙ্গু হলে বাড়িতে কীভাবে যত্ন নেবেন?

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসনাশক চিকিৎসা নেই। তবে যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসক বাড়িতে পরিচর্যা বা হাসপাতালে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত দেবেন।

পর্যাপ্ত তরল পান করুন: পানি, খাবার স্যালাইন, স্যুপসহ উপযুক্ত তরল পানিশূন্যতা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্য কোনো রোগ থাকলে সে অনুযায়ী তরলের প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হবে। বারবার বমি হলে বা পান করতে না পারলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।

বিশ্রাম নিন: জ্বর ও দুর্বলতার সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রয়োজন। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন। প্রয়োজন হলে নিয়মিত ফলোআপ ও রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।

ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন: জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেনসহ কিছু প্রদাহনাশক ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তাই চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করবেন না।

অন্যদের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখুন: ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশার মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। তাই অসুস্থ অবস্থায় মশারি ব্যবহার করা এবং মশার কামড় এড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

যাঁদের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন

ছোট শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকলেও নতুন করে সংক্রমণকে অবহেলা করা যাবে না। পরবর্তী সংক্রমণে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। এসব ব্যক্তির জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ দ্রুত নেওয়া ভালো।

আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই পারে জীবন বাঁচাতে

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই যে গুরুতর জটিলতা হবে, তা নয়। তবে বিপৎসংকেত সম্পর্কে সচেতন না থাকলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।

লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ—এসব পদক্ষেপ ডেঙ্গু মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর কমেছে মানেই বিপদ কেটে গেছে—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে রোগীর পুরো অসুস্থতার সময় সতর্ক থাকাই সবচেয়ে জরুরি।

 

 

Comment / Reply From