ইতিহাস কাঁপানো সেই ভূমিকম্প
প্রকৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর দুর্যোগগুলোর একটি ভূমিকম্প। কয়েক সেকেন্ডের শক্তিশালী কম্পনেই চোখের সামনে ভেঙে পড়তে পারে ঘরবাড়ি, বদলে যেতে পারে ভূপ্রকৃতি, থেমে যেতে পারে হাজারো মানুষের জীবন। আধুনিক সময়ে জাপান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও চীনের মতো দেশ ভয়াবহ ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ দেখেছে। তবে প্রাণহানির দিক থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্পগুলোর একটি ঘটেছিল প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে চীনে।
তিব্বত থেকে জাপান—ভূমিকম্পের ভয়াবহ স্মৃতি
তিব্বতে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা আবারও বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পের ভয়াবহতা। ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প অতীতে বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংস ডেকে এনেছে।
২০১১ সালে জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ানে ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণ হারান ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ। ২০১৫ সালে নেপালে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে ইন্দোনেশিয়াতেও ৭.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে।
তবে প্রাণহানির বিচারে এসব দুর্যোগকে ছাড়িয়ে যায় ১৫৫৬ সালের চীনের শানসি ভূমিকম্প।
১৫৫৬ সালের সেই ভয়াবহ সকাল
সময়টা ছিল ১৫৫৬ সালের ২৩ জানুয়ারি। মিং সম্রাট জিয়াজিংয়ের শাসনামলে শীতের এক সকালে প্রবল কম্পনে কেঁপে ওঠে চীনের শানসি অঞ্চল। আধুনিক রিখটার স্কেল তখন ছিল না। পরবর্তী গবেষণায় ধারণা করা হয়, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল প্রায় ৮ থেকে ৮.৩।
ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল হিসেবে ওয়েই নদী উপত্যকার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রবল কম্পনে মাটিতে সৃষ্টি হয় বিশাল ফাটল। কোথাও কোথাও সেই ফাটল দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে। পাহাড় ধসে পড়ে, জনবসতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং বহু স্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
প্রাণ হারান লাখ লাখ মানুষ
১৫৫৬ সালের এই ভূমিকম্পকে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ভূমিকম্পের তাৎক্ষণিক আঘাতের পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে ধস, বন্যা, দুর্ভিক্ষ ও রোগবালাইয়ের কারণেও প্রাণহানি বাড়তে থাকে।
সেই সময় চীনের জনসংখ্যা ছিল আজকের তুলনায় অনেক কম। ফলে এত বিপুল মানুষের মৃত্যু পুরো অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
গুহার ঘরই হয়ে উঠেছিল মৃত্যুফাঁদ
শানসি অঞ্চলের বহু মানুষ তখন পাহাড়ের নরম পাথর কেটে তৈরি ‘ইয়াওডং’ নামের গুহাবাড়িতে বসবাস করতেন। ভূমিকম্পের প্রবল কম্পনে এসব গুহার ছাদ ও পাথরের দেয়াল ধসে পড়ে।
অনেক মানুষ ঘুমন্ত অবস্থাতেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। শুধু বসতবাড়ি নয়, শহরের অবকাঠামোর বড় অংশও ধ্বংস হয়ে যায়। পাহাড়ধসের কারণে পুরো জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ভূমিকম্পের পরও থামেনি বিপর্যয়
মূল ভূমিকম্পের পর একের পর এক পরাঘাত বা আফটারশক চলতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভূমিধস ও বন্যা। ইয়েলো ও ওয়েই নদীর পানি উপচে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এরপর দুর্ভিক্ষ ও রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের ধাক্কা থেমে গেলেও তার ভয়াবহ প্রভাব বহুদিন ধরে মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে রাখে।
ভূপ্রকৃতিতেও এসেছিল বড় পরিবর্তন
এই ভূমিকম্পের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, কিছু এলাকায় মাটি ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। কোথাও ভূমি ধসে নিচে নেমে যায়, আবার কোথাও সমতল ভূমি উঁচু হয়ে ছোট পাহাড়ের মতো আকৃতি নেয়। নদীর গতিপথ ও স্থানীয় ভূপ্রকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা দেয়।
এত বেশি প্রাণহানি কেন?
ভূমিকম্পটির মাত্রা ভয়াবহ হলেও শুধু কম্পনের শক্তিই এত বিপুল প্রাণহানির কারণ ছিল না। সে সময় শানসি ছিল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। অনেক মানুষ দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ গুহাবাড়িতে বসবাস করতেন। ফলে ভূমিকম্পের সময় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি ধসে পড়ে।
এ ছাড়া সে সময় ভূমিকম্প সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, উদ্ধারব্যবস্থা ও দুর্যোগ মোকাবিলার আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। ফলে বিপর্যয়ের মাত্রা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
বদলে যায় বসবাসের ধরন
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর মানুষ ধীরে ধীরে ঝুঁকিপূর্ণ গুহাবাস থেকে সরে এসে তুলনামূলক হালকা কাঠ ও বাঁশের ঘর নির্মাণের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নিরাপদ আবাসন ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১৫৫৬ সালের শানসি ভূমিকম্প আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদাহরণ। পৃথিবীতে এর চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকম্প ঘটেছে, কিন্তু প্রাণহানির বিচারে শানসির সেই বিপর্যয় এখনো ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!