Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 October 2026
একসময় ৭৫ হাজার ভাষা, এখন কোথায় সেগুলো?

একসময় ৭৫ হাজার ভাষা, এখন কোথায় সেগুলো?

একসময় পৃথিবীতে ছিল ৭৫ হাজার ভাষা, আজ টিকে আছে মাত্র ৭৫০০!

পৃথিবীতে এখন প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি ভাষা প্রচলিত। ইংরেজি, মান্দারিন চীনা, হিন্দি, স্প্যানিশ ও আরবির মতো ভাষায় কথা বলেন বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ। কিন্তু মানবসভ্যতার অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাষার বৈচিত্র্য একসময় আজকের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে, কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবীতে একই সময়ে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত ছিল। সময়ের সঙ্গে বড় বড় রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের বিস্তার, জনসংখ্যার পরিবর্তন এবং ভাষার ব্যবহার বদলে যাওয়ায় সেই বৈচিত্র্যের বড় অংশ হারিয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিদ ক্লেয়ার বাওয়ার্ন ও তাঁর সহগবেষক ড্যামিয়ান ব্লাসির নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ। গবেষকেরা ভাষাবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, জনসংখ্যার উপাত্ত এবং গাণিতিক মডেল ব্যবহার করে গত প্রায় ১২ হাজার বছরে পৃথিবীর ভাষাগত বৈচিত্র্য কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করেছেন।

ভাষার বৈচিত্র্য একসময় ছিল শীর্ষে

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১২ হাজার বছর আগে হোলোসিন যুগের শুরুতে পৃথিবীতে আনুমানিক ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ২০০টি ভাষা প্রচলিত ছিল। তখন মানুষ ছোট ছোট দলে বসবাস করত এবং শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

পরবর্তীকালে কৃষির বিকাশ, স্থায়ী বসতি গড়ে ওঠা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন জনগোষ্ঠী ও ভাষার বিকাশ ঘটে। ফলে ভাষার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, প্রায় এক থেকে তিন হাজার বছর আগে পৃথিবীর ভাষাগত বৈচিত্র্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সে সময় একই সঙ্গে কয়েক দশ হাজার ভাষার অস্তিত্ব থাকতে পারে।

তবে প্রাচীনকালে প্রচলিত ভাষার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ লেখার প্রচলন হওয়ার আগে ভাষার সংখ্যা সম্পর্কে সরাসরি ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। গবেষণায় পাওয়া সংখ্যাগুলো তাই বিভিন্ন তথ্য ও গাণিতিক মডেলের ভিত্তিতে করা অনুমান।

সাম্রাজ্যের বিস্তারে হারিয়েছে বহু ভাষা

ভাষার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানবসমাজের উত্থান-পতন, অভিবাসন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন। বড় রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে কিছু ভাষা প্রশাসন, বাণিজ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এতে ছোট জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার ব্যবহার ক্রমে কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

গবেষকদের মতে, ভাষাগত বৈচিত্র্যের পতন শুধু ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের সময় শুরু হয়নি। তার অনেক আগেই বড় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের কারণে বহু ভাষা হারিয়ে যেতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে উপনিবেশবাদ, জোরপূর্বক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং স্থানীয় ভাষার ব্যবহার সীমিত করার নীতিও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তাদের ভাষাও হারিয়ে যেতে পারে। আবার মানুষ বেঁচে থাকলেও পরবর্তী প্রজন্ম অন্য কোনো প্রভাবশালী ভাষায় কথা বলতে শুরু করলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষাটির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ভাষা হারানো আর নতুন ভাষার জন্ম

সব ভাষার পরিবর্তনের পরিণতি বিলুপ্তি নয়। কিছু ভাষা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে নতুন ভাষায় রূপ নিয়েছে। যেমন, প্রাচীন লাতিন ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ থেকে ফরাসি, ইতালীয় ও স্প্যানিশ ভাষার বিকাশ ঘটেছে।

অন্যদিকে, অনেক জনগোষ্ঠীর ভাষা নতুন ভাষার প্রভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। আয়ারল্যান্ডে ইংরেজির প্রভাব, আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসী ভাষাগুলোর ওপর ঔপনিবেশিক শাসনের চাপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় ভাষার বিস্তার এ ধরনের পরিবর্তনের উদাহরণ।

তবে সব ভাষা একইভাবে হারিয়ে যায়নি। কিছু প্রাচীন ভাষা ও ভাষাগত ঐতিহ্য নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে রয়েছে। কোনো ভাষার ব্যবহার কমে গেলেও সম্প্রদায়ের মানুষ সচেতনভাবে সেটিকে শেখানো, চর্চা ও সংরক্ষণ করলে পুনরুজ্জীবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের অর্ধেক ভাষাই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে

বর্তমানে প্রচলিত ভাষাগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনো মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ভাষাবিদদের বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মাত্র ১০ শতাংশ ভাষায় কথা বলে। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক ভাষা ব্যবহার করেন তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক মানুষ।

কোনো ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা কমতে থাকলে সেটি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর সুযোগও সংকুচিত হয়। পরিবারে মাতৃভাষার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় সেই ভাষার অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে অন্য ভাষার ওপর নির্ভরতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে ভাষার ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নির্ধারিত নয়। শিক্ষা, নথিভুক্তকরণ, মাতৃভাষায় বই ও ডিজিটাল উপকরণ তৈরি এবং নতুন প্রজন্মকে ভাষা শেখানোর উদ্যোগের মাধ্যমে অনেক বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ করা সম্ভব।

ভাষা হারানো মানে ইতিহাসের এক অংশ হারানো

ভাষা শুধু মানুষের ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়। এর মধ্যে জমা থাকে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, লোককথা, বিশ্বাস, প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান, জীবনযাত্রা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা। একটি ভাষা হারিয়ে গেলে সেই ভাষায় সংরক্ষিত অনেক জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

গবেষণাটি মনে করিয়ে দিয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত ভাষাগুলো মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। অতীতে অসংখ্য ভাষার জন্ম হয়েছে, পরিবর্তিত হয়েছে, আবার হারিয়েও গেছে। এই বৈচিত্র্যের বড় অংশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো সীমিত।

তাই ভাষা সংরক্ষণ শুধু ভাষাবিদদের কাজ নয়; এটি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ভাষা যত ছোট জনগোষ্ঠীর মধ্যেই প্রচলিত থাকুক না কেন, মানবসভ্যতার ইতিহাসে তার নিজস্ব মূল্য রয়েছে।

Description: সাম্প্রতিক এক গবেষণার মডেল অনুযায়ী, কয়েক হাজার বছর আগে পৃথিবীতে একই সময়ে ৩০ হাজার থেকে ৭৫ হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত থাকতে পারে। বর্তমানে ভাষাগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার কারণ ও বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব জানুন।

Tag words: ভাষা বিলুপ্তি, পৃথিবীর ভাষা, ভাষাগত বৈচিত্র্য, ভাষা সংরক্ষণ, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লেয়ার বাওয়ার্ন, ড্যামিয়ান ব্লাসি, মানবসভ্যতা, বিপন্ন ভাষা, ভাষাবিজ্ঞান

Keywords: পৃথিবীতে কত ভাষা প্রচলিত, পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া ভাষা, ভাষা বিলুপ্তির কারণ, প্রাচীন ভাষার ইতিহাস, বিশ্বের বিপন্ন ভাষা, ভাষাগত বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা, মাতৃভাষা সংরক্ষণ, সায়েন্স সাময়িকীর ভাষা গবেষণা

Short, interesting heading: 

Comment / Reply From