Dark Mode
Image
  • Tuesday, 07 July 2026
খাগড়াছড়ির পাহাড়ে আলো ছড়াচ্ছেন নারী ইলেকট্রিশিয়ান নিপা

খাগড়াছড়ির পাহাড়ে আলো ছড়াচ্ছেন নারী ইলেকট্রিশিয়ান নিপা

খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি পথে কাঁধে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে প্রতিদিন এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ছুটে বেড়ান এক তরুণী। তার লক্ষ্য পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়া। সোলার প্যানেল স্থাপন, বৈদ্যুতিক ত্রুটি মেরামত এবং বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নানা সমস্যার সমাধান করেই তিনি বদলে দিচ্ছেন অসংখ্য মানুষের জীবন। তিনি নিপা ত্রিপুরা—খাগড়াছড়ি জেলার একমাত্র নারী ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে যিনি এখন অনেক নারীর অনুপ্রেরণার নাম।

স্বপ্ন থেকে বাস্তবের পথচলা

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার গাছবান অমৃতপাড়ার কৃষক খুপেন্দ্র ত্রিপুরার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট নিপা। শৈশব থেকেই বাবার সঙ্গে জুমচাষে কাজ করলেও তার আগ্রহ ছিল বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, সুইচবোর্ড ও ইলেকট্রনিক্সের কাজে।

প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে তিনি নিজের আগ্রহকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। কঠোর পরিশ্রম, প্রশিক্ষণ এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে আজ তিনি পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীক।

প্রশিক্ষণেই তৈরি দক্ষতা

নিপা জানান, খাগড়াছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি সম্পন্ন করার পর তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আনন্দ থেকে ছয় মাসের সোলার প্যানেল স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ নেন।

এরপর পিকেএসএফ-এর অধীনে তিন মাসের বৈদ্যুতিক মেরামতের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করার পর উন্নয়ন সংস্থা আনন্দ তাকে সহকারী ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

বর্তমানে তিনি সংস্থার সোলার প্রকল্পে কাজ করার পাশাপাশি অবসর সময়ে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে বৈদ্যুতিক ত্রুটি মেরামত করে অতিরিক্ত আয় করছেন।

পাহাড়ের ঘরে ঘরে আলো

বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত কিংবা বিদ্যুৎ সমস্যায় থাকা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে নিপা এখন পরিচিত মুখ। তিনি সোলার প্যানেল স্থাপন, ব্যাটারি সংযোগ, তারের ত্রুটি মেরামতসহ নানা ধরনের বৈদ্যুতিক কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে প্রতিদিন মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ কাজ নয়। কিন্তু সেই কঠিন পথকেই নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছেন তিনি।

পরিবারের গর্ব

নিপার বাবা খুপেন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, মেয়ের এই পেশা নিয়ে তারা গর্বিত। তাদের বাড়িতেও যে সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও নিপার নিজের হাতে স্থাপন করা।

তার ভাষায়, বিদ্যুৎ চলে গেলেও সোলার ব্যবস্থার কারণে এখন তাদের ঘর আলোয় আলোকিত থাকে।

প্রশিক্ষকদের চোখে সফলতার গল্প

নিপার প্রশিক্ষক মো. বেলাল হোসেন জানান, সোলার স্থাপন ও বৈদ্যুতিক মেরামতের প্রশিক্ষণে নিপাই ছিলেন একমাত্র নারী অংশগ্রহণকারী। কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার মাধ্যমে তিনি সফলভাবে প্রশিক্ষণ শেষ করেন এবং খুব অল্প সময়েই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দেন।

অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা

উন্নয়ন সংস্থা আনন্দ-এর আঞ্চলিক কর্মকর্তা শ্যামল অগাস্টিন রোজারিও বলেন, নিপা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেননি, তিনি পাহাড়ি অঞ্চলের নারীদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি সংস্থার সোলার ও ক্লিন এনার্জি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের বৈদ্যুতিক সমস্যা সমাধান করে বাড়তি আয় করছেন এবং নারীরা চাইলে প্রযুক্তিনির্ভর পেশাতেও সফল হতে পারেন—সেই বার্তাই ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

বদলে দিচ্ছেন পাহাড়ের চিত্র

যেখানে অনেক নারী এখনো নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন, সেখানে নিপা ত্রিপুরা নিজের দক্ষতা, সাহস ও পরিশ্রম দিয়ে প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো পেশাই নারীদের জন্য অসম্ভব নয়।

দুর্গম পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে হাঁটতে হাঁটতে তিনি শুধু সোলার প্যানেলই বসাচ্ছেন না, ছড়িয়ে দিচ্ছেন আত্মবিশ্বাস, সম্ভাবনা আর নতুন জীবনের আলো।

Comment / Reply From