Dark Mode
Image
  • Monday, 26 October 2026
চীনের বুকে এক টুকরো স্বপ্নরাজ্য

চীনের বুকে এক টুকরো স্বপ্নরাজ্য

প্রাচীন চীনা স্থাপত্য, কারুকার্যময় সেতু, শান্ত জলাশয় আর রঙিন কোই মাছের বিচরণ—সব মিলিয়ে যেন কোনো শিল্পীর কল্পনা থেকে উঠে আসা এক জগৎ। অথচ এটি কল্পনা নয়, চীনের গুয়াংজুর বুকে বাস্তবেই রয়েছে এমন এক স্থান, যার সৌন্দর্য দেখে মনে হয় ইতিহাসের পাতার ভেতর দিয়ে হাঁটছি। নাম তার বাওমো গার্ডেন।

কিছু ভ্রমণ শুধু নতুন কোনো জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে না; তা হয়ে ওঠে স্মৃতিতে জমে থাকা একেকটি গল্প। যাত্রাপথের উৎকণ্ঠা, নতুন শহরের ব্যস্ততা আর অচেনা কোনো স্থানে গিয়ে হঠাৎ মুগ্ধ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অনন্য এক অভিজ্ঞতা। বাওমো গার্ডেনে যাওয়ার গল্পটিও তেমন।

বৃষ্টিভেজা ঢাকা থেকে গুয়াংজুর পথে

২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল। গন্তব্য চীনের গুয়াংজু শহর। বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্য মেলা ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। কিন্তু উড়োজাহাজে ওঠার আগেই দিনটি রীতিমতো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল।

সকাল থেকে ঢাকায় টানা বৃষ্টি, তার সঙ্গে অসহনীয় যানজট। যে পথ সাধারণত এক ঘণ্টারও কম সময়ে পাড়ি দেওয়া যায়, সেদিন সেখানে আটকে থাকতে হয় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। সময় যত গড়াচ্ছিল, ততই বাড়ছিল উদ্বেগ। এত দিনের প্রস্তুতি আর পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাবে না তো?

একসময় অপেক্ষা করার আর সুযোগ ছিল না। এক্সপ্রেসওয়ের মাঝপথে গাড়ি থেকে নেমে ব্যাগ ও লাগেজ হাতে হাঁটতে শুরু করি। কখনো দ্রুত পায়ে, কখনো প্রায় দৌড়ে এগিয়ে চলি বিমানবন্দরের দিকে। চারপাশে গাড়ির হর্ন, বৃষ্টির শব্দ আর মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে তখন একটাই চিন্তা—সময়মতো পৌঁছাতে হবে।

অবশেষে বিমানবন্দরে পৌঁছে চেক-ইন কাউন্টারের সামনে দাঁড়াতেই দেখা গেল, নির্ধারিত সময় শেষ হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। সেই মুহূর্তের স্বস্তি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। উড়োজাহাজে নিজের আসনে বসার পরই প্রথমবার মনে হলো, যাত্রা তাহলে সত্যিই শুরু হলো।

গুয়াংজুর বাইয়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে রাতের আলোয় ঝলমলে শহরটিকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে এসে পড়েছি। পরদিন থেকেই শুরু হয় ক্যান্টন ফেয়ারের ব্যস্ততা। বিশ্বের নানা দেশ থেকে আসা ব্যবসায়ী, নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যের সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ।

কাজের ব্যস্ততা চলছিল পুরোদমে। তবু নতুন শহর দেখার আগ্রহটা দমিয়ে রাখা যায়নি। কখনো ক্যান্টন টাওয়ারের আশপাশে হাঁটা, কখনো মেট্রোতে চেপে অন্য এলাকায় চলে যাওয়া—এভাবেই কাজের ফাঁকে গুয়াংজুকে একটু একটু করে চিনছিলাম।

এরই মধ্যে এক সন্ধ্যায় ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে চোখে পড়ে বাওমো গার্ডেনের ছবি। ছবিগুলোতে ছিল প্রাচীন স্থাপত্য, পানির ওপর সেতুর প্রতিচ্ছবি আর সবুজের অপরূপ সমন্বয়। মনে হলো, এটি নিছক কোনো উদ্যান নয়; বরং চীনা শিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। তখনই ঠিক করে ফেললাম, জায়গাটিতে যেতেই হবে।

বাওমো গার্ডেনে এক সকাল

২৩ এপ্রিল ভোরে বেরিয়ে পড়লাম বাওমো গার্ডেনের উদ্দেশে। গুয়াংজুর শহুরে ব্যস্ততা ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। জানালার বাইরে বদলে যাচ্ছিল দৃশ্যপট—কংক্রিটের ভবনের জায়গা নিচ্ছিল সবুজ প্রকৃতি ও অপেক্ষাকৃত শান্ত পরিবেশ।

প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রা শেষে পৌঁছালাম গন্তব্যে। উদ্যানের প্রবেশপথ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, সময়ের সীমানা পেরিয়ে চলে এসেছি অন্য কোনো যুগে। চারদিকে ইতিহাসের ছাপ, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য আর নিপুণ শিল্পকর্মের সমাহার।

প্রথমেই চোখ আটকে গেল বিশাল এক পোর্সেলিন রিলিফে। এর নাম ‘অ্যালং দ্য রিভার ডিউরিং দ্য চিংমিং ফেস্টিভাল’। চীনের ঐতিহাসিক জনজীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি এই শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নদীর তীরের ব্যস্ত জনপদ, বাজার, নৌকা, চলাচলরত মানুষ আর দৈনন্দিন জীবনের নানা দৃশ্য।

কাজটির বিশালত্ব ও সূক্ষ্ম কারুকাজ সামনে থেকে না দেখলে বোঝা কঠিন। মনে হচ্ছিল, বহু শতাব্দী আগের একটি শহর যেন দেয়ালের গায়ে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম কয়েক মুহূর্ত ক্যামেরা বের করার কথাই ভুলে গিয়েছিলাম। শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিলাম প্রতিটি খুঁটিনাটি।

কিছুক্ষণ পর ক্যামেরা হাতে নিলাম। একের পর এক ছবি তুলতে শুরু করলাম। প্রতিটি ফ্রেমে ধরে রাখতে চাইছিলাম বিস্ময়ের সেই মুহূর্ত, যদিও জানতাম, ছবিতে জায়গাটির পুরো অনুভূতি কখনোই ধরা সম্ভব নয়।

ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে বাওমো গার্ডেন

বাগানের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে এর ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে পারি। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৬৭৮ সালে চীনের চিং রাজবংশের সময় বাওমো গার্ডেনের সূচনা হয়েছিল। ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে পরিচিত বাও ঝেং বা বাও গংয়ের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে এই উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সময় ও নানা পরিবর্তনের কারণে পুরোনো উদ্যানটি একসময় হারিয়ে যায়। পরে ১৯৯৫ সালে পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে বাওমো গার্ডেন নতুন করে গড়ে তোলা হয়। ফলে আজকের এই স্থান শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জায়গা নয়; চীনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

বাগানের পথে পথে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনাগুলো যেন সেই ইতিহাসের নানা অধ্যায় তুলে ধরে। কোথাও লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী ভবন, কোথাও বাঁকানো ছাদের প্যাভিলিয়ন, আবার কোথাও সূক্ষ্ম নকশায় সাজানো করিডর। প্রতিটি স্থাপনার নকশায় রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।

সেতু, জলাশয় আর রঙিন কোই মাছের মুগ্ধতা

বাওমো গার্ডেনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বারবার মনে হচ্ছিল, যেন কোনো প্রাচীন চীনা চিত্রকর্মের মধ্যে প্রবেশ করেছি। পাথরের সেতু, শান্ত জলরাশি, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য আর চারপাশের সবুজ—সবকিছু এমনভাবে সাজানো যে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন।

জলাশয়ের পানিতে ভবন ও সেতুর প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে। বাতাসে পানির ওপর সামান্য ঢেউ উঠলেই সেই প্রতিচ্ছবি ভেঙে নতুন এক দৃশ্য তৈরি হয়। কোথাও পাথরের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া যায়, কোথাও গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিরিবিলি সময় কাটানো যায়।

তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল কোই মাছের জলাশয়। শত শত রঙিন মাছ পানির নিচে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। জলাশয়ের ধারে দাঁড়াতেই অনেক মাছ একসঙ্গে কাছে চলে আসে। তাদের লাল, সাদা, হলুদ ও কমলা রঙের শরীর পানির ওপর ভেসে উঠলে পুরো জলাশয় যেন জীবন্ত ক্যানভাসে পরিণত হয়।

এমন দৃশ্য আগে কখনো এভাবে দেখিনি। একদিকে মাছের চলাচল, অন্যদিকে পানির ওপর স্থাপত্যের প্রতিচ্ছবি—সব মিলিয়ে মুহূর্তটি ছিল অসাধারণ।

ফটোগ্রাফারের জন্য স্বপ্নের ঠিকানা

যাঁরা ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বাওমো গার্ডেন বিশেষ আকর্ষণের একটি জায়গা। এখানে আলো, ছায়া, স্থাপত্য, পানি আর প্রকৃতি একসঙ্গে এমন সব দৃশ্য তৈরি করে, যা ক্যামেরায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে বারবার।

কখনো সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে দূরের প্যাভিলিয়নকে ফ্রেমে বন্দী করেছি, কখনো জলাশয়ের ধারে বসে পানির প্রতিচ্ছবি তুলেছি। আবার কখনো সূক্ষ্ম কারুকাজের সামনে দাঁড়িয়ে স্থাপত্যের নকশা ক্যামেরায় তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেলেই নতুন দৃশ্য চোখে পড়ছিল। যেন প্রতিটি বাঁকেই অপেক্ষা করছে আলাদা একটি ছবি। ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে ছবি জমছিল একের পর এক, আর মনের ভেতর তৈরি হচ্ছিল নতুন নতুন স্মৃতি।

তবে ছবি যতই সুন্দর হোক, বাস্তবে দাঁড়িয়ে চারপাশের পরিবেশ অনুভব করার অভিজ্ঞতা আলাদা। বাতাসের মৃদু প্রবাহ, পানির শান্ত শব্দ আর স্থাপত্যের নিখুঁত বিন্যাস—এসব অনুভূতি শুধু ছবির মাধ্যমে পুরোপুরি তুলে ধরা যায় না।

ফিরে আসার সময় যে অনুভূতি রয়ে গেল

বিকেলের দিকে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। যাওয়ার আগে একবার পেছনে ফিরে তাকালাম। দূরে শান্ত জলরাশির ওপর ভেসে আছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার প্রতিচ্ছবি। চারদিকে একধরনের নীরবতা, যেন জায়গাটি নিজের সৌন্দর্য নিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে।

সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম, সব সুন্দর জায়গা মানুষকে একইভাবে মুগ্ধ করে না। কোনো স্থান তার বিশালত্ব দিয়ে বিস্মিত করে, কোনোটি ইতিহাসের গভীরতা দিয়ে ভাবায়। আবার কিছু জায়গা আছে, যেগুলো নীরবে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

বাওমো গার্ডেন আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি জায়গা। ক্যান্টন ফেয়ারে অংশ নিতে গিয়ে শুরু হওয়া ব্যস্ত সফরের মধ্যে এই উদ্যান হয়ে উঠেছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা—যেখানে ইতিহাস, শিল্প, প্রকৃতি আর ব্যক্তিগত অনুভূতি একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

গুয়াংজুর সেই সফরের অনেক স্মৃতির ভিড়ে বাওমো গার্ডেন আজও আলাদা হয়ে আছে। কারণ, কিছু ভ্রমণের সৌন্দর্য শুধু গন্তব্যে নয়; তা থেকে যায় ফিরে আসার পরও, মনের গভীরে।


 

Comment / Reply From