জমিদারির গৌরব থেকে জরাজীর্ণ আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল
জমিদারির ঐশ্বর্য থেকে জরাজীর্ণতায় আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। সামনে থাকা দুটি পাথরের ভাস্কর্য ভাঙাচোরা। একটির মাথায় বসে আছে শালিক। ভবনের দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা, লোহার কাঠামোয় ধরেছে মরিচা। নিরাপত্তার জন্য চারপাশে টাঙানো হয়েছে কাঁটাতার। পাশে থাকা ইতিহাসের তথ্যফলকটিও হারিয়েছে আগের জৌলুস।
অথচ একসময় এই ভবন ছিল জমিদারি আমলের ঐশ্বর্য ও স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম নিদর্শন। ময়মনসিংহের জমিদারি ইতিহাসের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক আমলের নানা স্মৃতি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ময়মনসিংহ সফরের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এর নাম। দীর্ঘ সময়ের অবহেলায় সেই গৌরবের স্মৃতি এখন অনেকটাই ম্লান।
ময়মনসিংহ শহরের সার্কিট হাউস মাঠের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনাটির নাম আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত।
শতবর্ষ পেরিয়ে আজও দাঁড়িয়ে
ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৮৮৯ সালে মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল নির্মাণ করেন। কাঠ, লোহা, টিন ও বিভিন্ন ধাতব উপকরণ ব্যবহার করে নির্মিত ভবনটি তৎকালীন স্থাপত্যশৈলীর একটি ব্যতিক্রমী নিদর্শন।
১৩৬ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও স্থাপনাটি এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। জমিদারি আমলের স্থাপত্য দেখতে যেমন মানুষ এখানে আসেন, তেমনি বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির কারণেও জায়গাটির প্রতি আগ্রহ রয়েছে অনেকের।
ইতিহাস দেখতে এসে হতাশ দর্শনার্থীরা
ঐতিহাসিক এই স্থাপনা দেখতে মাঝেমধ্যেই দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। আনোয়ার ও আসনা দম্পতি তাদের মধ্যে অন্যতম। তারা জানান, সুযোগ পেলেই আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল দেখতে আসেন। তবে প্রতিবারই ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা তাদের হতাশ করে।
তাদের মতে, শুধু ভবনটি সংস্কার করলেই হবে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সমৃদ্ধ ইতিহাসও দর্শনার্থীদের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ একটি পুরোনো ভবন দেখার চেয়ে এর পেছনের ইতিহাস জানলেই এর গুরুত্ব আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব।
এনায়েত নামে আনন্দ মোহন কলেজের এক শিক্ষার্থীর নজরও আটকে যায় ভবনের সামনের ভাঙা পাথরের ভাস্কর্য দুটির দিকে। তার ভাষায়, ভাস্কর্যগুলোর বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয় শুধু স্থাপনাটিই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি জানান তিনি।
দ্রুত সংস্কারের তাগিদ
আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ অঞ্চলের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবনটির অবস্থা এখন নাজুক। সংস্কারের কাজ শুরু হতে দেরি হলে এর কোনো অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন বিপুল অর্থ ব্যয় করেও স্থাপনাটির আগের রূপ ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।
তিনি জানান, বর্তমানে ৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে এবং সেই প্রকল্পে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সংস্কারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সংস্কারের কাজ যেন ভবনের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও মূল কাঠামো বিবেচনায় রেখে যথাযথভাবে করা হয়, সেই দাবি জানান তিনি।
হারিয়ে যাচ্ছে ময়মনসিংহের পুরাকীর্তিও
পুরাকীর্তি বিশেষজ্ঞ স্বপন ধর মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের মূল কাঠামো ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তার ভাষায়, প্রতিটি বর্ষা, দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং ভবনের ভেঙে পড়া প্রতিটি অংশ স্থাপনাটির মূল রূপ থেকে কিছু না কিছু কেড়ে নিচ্ছে। সংস্কারের উদ্যোগ যত বিলম্বিত হবে, এর মূল কাঠামো ও ঐতিহাসিক উপাদান রক্ষা করা তত কঠিন হবে।
তিনি জানান, দুই বছরের গবেষণায় ময়মনসিংহ জেলায় ৩২০টি পুরাকীর্তির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪০টির কোনো অস্তিত্বই বর্তমানে নেই। এসব স্থাপনা রক্ষায় সরকারের কাছে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সংস্কারের প্রকল্প অনুমোদিত
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলসহ ময়মনসিংহের ১১টি পুরাকীর্তির সংস্কারের জন্য প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে।
কাজ শুরু হলে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলকে দর্শনার্থীদের জন্য আরও উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
একসময় জমিদারি ঐশ্বর্য ও স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে যে ভবন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত, আজ সেটিই অবহেলা ও সময়ের ক্ষয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। দ্রুত সংরক্ষণ ও সংস্কার করা না গেলে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশও হয়তো একদিন হারিয়ে যেতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!