পাহাড়ের বুকে স্বর্গের দরজা!
পৃথিবীর বুকে ‘স্বর্গের দুয়ার’, পাহাড়ের গায়ে প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি
স্বর্গের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। বাস্তবে স্বর্গের দেখা না মিললেও পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেগুলোর সৌন্দর্য দেখলে মনে হয় যেন স্বপ্নের কোনো জগতে এসে পড়েছেন। চীনের হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজি শহরের তিয়েনমেন পর্বতের ‘গেট অব হেভেন’ বা ‘স্বর্গের দুয়ার’ তেমনই এক বিস্ময়কর স্থান। বিশাল পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক এই দরজা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকেরা।
মেঘে ঢাকা পাহাড়, সুউচ্চ পাথুরে দেয়াল আর আকাশের দিকে উঠে যাওয়া দীর্ঘ সিঁড়ি—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন প্রকৃতির তৈরি এক অপূর্ব স্থাপত্য।
পাহাড়ের গায়ে বিশাল প্রাকৃতিক দরজা
চীনের হুনান প্রদেশের ঝাংজিয়াজি শহরে অবস্থিত তিয়েনমেন পর্বত। এই পর্বতের অন্যতম আকর্ষণ হলো তিয়েনমেন গুহা, যা বিশ্বজুড়ে ‘হেভেনস গেট’ নামে পরিচিত।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতার এই পাহাড়ের গায়ে তৈরি প্রাকৃতিক খিলানটির উচ্চতা প্রায় ১৩১ দশমিক ৫ মিটার এবং প্রস্থ ৫৭ মিটার। পাহাড়ের এক পাশ থেকে অন্য পাশে বিস্তৃত বিশাল এই ফাঁকা অংশ দেখতে অনেকটা আকাশের দিকে খোলা দরজার মতো। এ কারণেই এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্বর্গের দুয়ার’।
প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই বিশাল খিলান পৃথিবীর অন্যতম উঁচু পর্বতভেদী প্রাকৃতিক গুহামুখ হিসেবে পরিচিত। এখানকার দৃশ্য এতটাই ব্যতিক্রমী যে পর্যটকেরা একে প্রকৃতির বিস্ময় বলে অভিহিত করেন।
কীভাবে তৈরি হয়েছিল এই স্বর্গের দুয়ার?
তিয়েনমেন পর্বতের এই প্রাকৃতিক দরজার উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। চীনের স্থানীয় ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ২৬৩ খ্রিষ্টাব্দে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর পাহাড়ের গায়ে এই দরজার মতো ফাঁকা অংশ তৈরি হয়।
তখন পর্বতটির নাম ছিল সংলিয়াংশান। পরবর্তী সময়ে এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনার পর এর নামকরণ করা হয় তিয়েনমেনশান, যার অর্থ ‘স্বর্গের দরজার পাহাড়’।
পাহাড়ের দুই পাশের খাড়া পাথুরে দেয়াল আর মাঝখানের বিশাল ফাঁকা অংশ প্রকৃতির শক্তি ও ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের এক অসাধারণ নিদর্শন।
স্বর্গের দুয়ারে পৌঁছাতে ৯৯৯টি সিঁড়ি
এই প্রাকৃতিক দরজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর দিকে উঠে যাওয়া ৯৯৯টি সিঁড়ি। ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ নামে পরিচিত এই পথ দিয়ে পর্যটকেরা ধাপে ধাপে পাহাড়ের গুহামুখে পৌঁছান।
চীনা সংস্কৃতিতে ৯ সংখ্যাটি সৌভাগ্য, দীর্ঘস্থায়িত্ব ও চিরন্তনতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। সে কারণে ৯৯৯টি সিঁড়ির সংখ্যাটিও বিশেষ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে বলে মনে করা হয়।
তবে এতগুলো সিঁড়ি বেয়ে ওঠা সহজ কাজ নয়। পথটি বেশ খাড়া হওয়ায় পর্যটকদের শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। যাঁরা হেঁটে উঠতে চান না, তাঁদের জন্য বিভিন্ন সময়ে ক্যাবল কার, শাটল ও পাহাড়ের ভেতরের এসকেলেটরের মতো ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। এসব পরিবহনসুবিধার পরিচালনা ও প্রবেশপথ সময়ভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।
মেঘের ভেতর দিয়ে দেখা যায় অপূর্ব প্রকৃতি
তিয়েনমেন পর্বতের অন্যতম আকর্ষণ এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে দূর-দূরান্তের সবুজ উপত্যকা, ঘন বনভূমি ও পাহাড়ের সারি দেখা যায়।
বিশেষ করে বৃষ্টির পর কিংবা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় মেঘ যখন পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে চলাচল করে, তখন মনে হয় বিশাল দরজার ভেতর দিয়ে মেঘ প্রবেশ করছে। কখনো সূর্যের আলো পাহাড়ের ফাঁকা অংশ দিয়ে প্রবেশ করে তৈরি করে অপূর্ব দৃশ্য।
‘তিয়েনমেন吐雾’ বা স্বর্গের দুয়ার দিয়ে মেঘ বেরিয়ে আসার মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। এই দৃশ্যের কারণেই জায়গাটি আরও রহস্যময় ও স্বপ্নিল হয়ে ওঠে।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
তিয়েনমেন পর্বত শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসও। পর্বতের চূড়ায় রয়েছে ঐতিহাসিক তিয়েনমেন পর্বত মন্দির। তাং রাজবংশের সময় থেকে এই পাহাড়ে ধর্মীয় উপাসনার ঐতিহ্য গড়ে ওঠে বলে জানা যায়।
প্রাচীনকাল থেকেই পাহাড়টি আধ্যাত্মিক সাধনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি পবিত্র স্থান হিসেবেও পরিচিত। প্রকৃতির বিশালতা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সমন্বয় তিয়েনমেন পর্বতকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা।
কেন পর্যটকদের কাছে এত জনপ্রিয়?
প্রাকৃতিক দরজার পাশাপাশি তিয়েনমেন পর্বতে রয়েছে আরও বেশ কিছু আকর্ষণ। পাহাড়ের খাড়া দেয়াল ঘেঁষে তৈরি কাচের হাঁটার পথ বা গ্লাস স্কাইওয়াক পর্যটকদের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়। স্বচ্ছ কাচের ওপর দাঁড়িয়ে নিচের গভীর উপত্যকা দেখার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই রোমাঞ্চকর।
এ ছাড়া পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ৯৯ বাঁকের সড়ক, দীর্ঘ ক্যাবল কার এবং মেঘে ঢাকা পাহাড়ি পথ পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে তিয়েনমেন পর্বত তাই বিশেষ জনপ্রিয়।
সব মিলিয়ে, চীনের ‘স্বর্গের দুয়ার’ প্রকৃতির এক অসাধারণ সৃষ্টি। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি হওয়া বিশাল প্রাকৃতিক খিলান, ৯৯৯টি সিঁড়ি আর মেঘে ঘেরা পাহাড়ি সৌন্দর্য একে দিয়েছে অনন্য পরিচিতি। মানুষের তৈরি কোনো স্থাপত্য নয়, প্রকৃতির দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তনে সৃষ্টি হওয়া এই দরজা যেন পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বপ্নের প্রবেশপথ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!