Dark Mode
Image
  • Tuesday, 03 November 2026
পাঁচ টাকার নোট থেকে বাস্তবের ঐতিহাসিক মসজিদ!

পাঁচ টাকার নোট থেকে বাস্তবের ঐতিহাসিক মসজিদ!

পাঁচ টাকার নোটের সেই কুসুম্বা মসজিদ, পাথরে খোদাই করা ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন

বাংলাদেশের পাঁচ টাকার কাগজের নোটে একসময় যে মসজিদের ছবি দেখা যেত, সেটি শুধু একটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বাংলার স্থাপত্য ও ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। কালো পাথরের আবরণ, ছয়টি গম্বুজ, কারুকার্যময় মেহরাব আর পাশের বিশাল দিঘি—সব মিলিয়ে কুসুম্বা মসজিদ যেন অতীতের এক জীবন্ত স্মারক।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখতে। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পর্যটনের ক্ষেত্রেও মসজিদটি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে।

নওগাঁর মান্দায় ইতিহাসের নিদর্শন

কুসুম্বা মসজিদের অবস্থান নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে, নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের পশ্চিম পাশে। নওগাঁ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। আত্রাই নদীর পশ্চিম তীরবর্তী এই স্থাপনাটি প্রাচীরঘেরা একটি চত্বরের মধ্যে অবস্থিত।

মসজিদের প্রবেশপথের ওপরে থাকা শিলালিপি থেকে জানা যায়, ৯৬৬ হিজরি বা ১৫৫৮-৫৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় আফগান শাসনামলে শূর বংশের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের আমলে সুলায়মান নামের একজন ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। তিনি সম্ভবত তৎকালীন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। সেই হিসাবে মসজিদটির বয়স এখন প্রায় ৪৬৮ বছর। <Cite refs={["turn272791search0","turn272791search4"]}/>

কালো পাথরে মোড়ানো অনন্য স্থাপত্য

কুসুম্বা মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর গাঢ় কালো পাথরের আবরণ। মূল কাঠামো ইটের তৈরি হলেও দেয়ালের বাইরের অংশ এবং ভেতরের কিছু অংশ পাথর দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। এ কারণে মসজিদটি দেখতে অন্যান্য অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনার চেয়ে আলাদা।

আয়তাকার এই মসজিদের ছাদে রয়েছে দুই সারিতে সাজানো মোট ছয়টি গম্বুজ। চার কোণে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে লতাপাতা, ফুল ও জ্যামিতিক নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়। বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতির সঙ্গে এসব অলংকরণের সমন্বয় মসজিদটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য। <Cite refs={["turn272791search2","turn272791search3"]}/>

মসজিদের পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ। ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে, যেগুলোর গায়ে পাথরে খোদাই করা আঙুরগুচ্ছ ও লতাপাতার নকশা বিশেষভাবে নজর কাড়ে। উত্তর-পশ্চিম কোণে রয়েছে একটি উঁচু আসন, যা দেখতে অনেকটা বিশেষ মঞ্চের মতো। এর ব্যবহার সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত রয়েছে।

১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মসজিদ

দীর্ঘ ইতিহাসের পথে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে কুসুম্বা মসজিদ। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে স্থাপনাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে এর সংস্কার ও সংরক্ষণের কাজ করা হয়।

বর্তমানে মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি। ২০১৭ সালে এর আশপাশের পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করতে ফুলের বাগান ও আলোকসজ্জার কাজ করা হয়। দিঘির পাড় ও মসজিদ চত্বরের সৌন্দর্য বাড়ানোর উদ্যোগেও পর্যটকদের জন্য জায়গাটি আরও মনোরম হয়ে উঠেছে।

মসজিদের পাশেই বিশাল দিঘি

কুসুম্বা মসজিদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে এর সামনের বিশাল দিঘি। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, দিঘিটির আয়তন প্রায় ৭৭ বিঘা। এর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১ হাজার ২৫০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ৯০০ ফুট।

দিঘির পানিতে নামার জন্য রয়েছে দুটি দৃষ্টিনন্দন সিঁড়ি। মুসল্লিরা এখানে অজু করেন, আবার দর্শনার্থীরাও হাত-মুখ ধুয়ে বিশ্রাম নেন। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও দিঘিটির ব্যবহার রয়েছে।

দিঘিটি ঘিরে একটি লোককথাও প্রচলিত। কথিত আছে, এর তলদেশে পারদ মেশানো থাকায় পানিতে কচুরিপানা বা অন্যান্য আগাছা জন্মায় না। তবে এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তাই বিষয়টিকে স্থানীয় জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা উচিত।

রাস্তার পাশে কালো পাথর, আছে শিলালিপির গল্প

মসজিদের মূল প্রবেশপথের কিছুটা আগে রাস্তার পাশে একটি বাক্সের মতো কালো পাথর দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, এক কৃষক জমিতে চাষ করার সময় পাথরটি খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে সেটি রাস্তার পাশে এনে রাখা হয়।

পাথরটির গায়ে আরবি ভাষায় উৎকীর্ণ শিলালিপি রয়েছে বলে জানা যায়। সেখানে সুলতানি আমলের শাসক ও অভিজাত ব্যক্তিদের নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ কারণে পাথরখণ্ডটিকে স্থানীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কাছেই রয়েছে রহস্যঘেরা সোনাদীঘি

কুসুম্বা মসজিদের পশ্চিম দিকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে রয়েছে আরেকটি দিঘি, যার নাম সোনাদীঘি। মসজিদ ও সামনের বড় দিঘি দেখতে আসা অনেক দর্শনার্থীর চোখ এড়িয়ে যায় এই জায়গাটি।

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসাইন শাহের সোনা নামের এক কন্যা ছিলেন। তাঁর অকালমৃত্যুর স্মৃতি ধরে রাখতেই নাকি এই দিঘি খনন করা হয়েছিল। তবে গল্পটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিশ্চিত নয়। তবু কুসুম্বা এলাকার ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে এই দিঘির নাম জড়িয়ে রয়েছে।

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও প্রয়োজন আরও সুযোগ-সুবিধা

ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে কুসুম্বা মসজিদ নওগাঁর অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। বিশেষ করে দুই ঈদ ও বিভিন্ন ছুটির দিনে এখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে। মসজিদ কমিটির উদ্যোগে ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সময়ে সৌন্দর্যবর্ধন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, মসজিদ ও দিঘি দেখার পর দর্শনার্থীদের অবসর কাটানো বা বিশ্রাম নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনো প্রয়োজন। বিশেষ করে দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের জন্য পর্যাপ্ত বসার জায়গা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, বিশ্রামাগার ও পর্যটনসুবিধা বাড়ানো গেলে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আরও ভালো হবে।

সব মিলিয়ে কুসুম্বা মসজিদ শুধু পাঁচ টাকার নোটে দেখা একটি স্থাপনার নাম নয়; এটি বাংলার সুলতানি আমলের ইতিহাস, পাথরের কারুকাজ এবং স্থাপত্যশিল্পের অনন্য সাক্ষ্য। শত শত বছর পেরিয়েও এর সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অটুট রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটনসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

 

Comment / Reply From