লক্ষ্মীপুরের আড়াই শ বছরের ইতিহাসে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
প্রাচীন জমিদার বাড়ির রাজকীয় স্থাপত্য, পুরোনো দিনের নানা স্মৃতিচিহ্ন আর বিশাল জলাশয়—সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজারে রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনন্য এক নিদর্শন। এর এক পাশে প্রায় আড়াই শ বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ি, অন্য পাশে ঐতিহাসিক খোয়া সাগর দিঘি। দীর্ঘদিন অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা এই স্থাপনাগুলোকে ঘিরে এবার নতুন করে পর্যটন সম্ভাবনা দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। শুরু হয়েছে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ।
লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পালের মতে, দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পিতভাবে এগুলো সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা গেলে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
ইতিহাসের সাক্ষী জমিদার বাড়ি ও বিশাল দিঘি
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক এই দুটি নিদর্শন। বাজার থেকে প্রায় ২৫০ গজ পূর্বে ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের উত্তর পাশে রয়েছে প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত খোয়া সাগর দিঘি। মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে দিঘির বিপরীত দিকে রয়েছে জমিদার বাড়ির মঠ, যা স্থানীয়ভাবে মঠবাড়ি নামে পরিচিত।
অন্যদিকে দালাল বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের পাশে প্রায় পাঁচ একর জায়গাজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো জমিদার বাড়ি। এর ভেতরে রয়েছে পরিত্যক্ত রাজগেট, রাজপ্রাসাদ, অন্দরমহল, শান বাঁধানো ঘাট, নাটমন্দির, পূজামণ্ডপ, বিশাল লোহার সিন্দুক, কয়েক টন ওজনের লোহার বিম, বাগান ও সীমানাপ্রাচীর। রয়েছে ছোট-বড় তিনটি পুকুরও।
দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় স্থাপনাটির বেশ কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন হারিয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিদার বাড়ির বিচার আসন ও নৃত্য আসন চুরি হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ী পরিবার থেকে জমিদারির ইতিহাস
স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর আগে লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব কলকাতা থেকে লক্ষ্মীপুরে কাপড়ের ব্যবসা করতে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর বংশধরেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক এজেন্সি লাভ করেন এবং পরে জমিদারিতে প্রতিষ্ঠিত হন।
১৭৬৫ সালে লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণবের নাতি গৌর কিশোর রায় প্রথম রাজা উপাধি লাভ করেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। ধারণা করা হয়, সেই সময়েই খোয়া সাগর দিঘি খনন এবং জমিদার বাড়ি নির্মাণ করা হয়। ফলে স্থাপনাগুলো শুধু স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, স্থানীয় ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিংয়েও আকর্ষণ
দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘিতে দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্মীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ঘুরতে আসেন। পুরোনো স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক পরিবেশের কারণে চলচ্চিত্র ও নাটকের শুটিংয়ের স্থান হিসেবেও জায়গা দুটি নির্মাতাদের আকৃষ্ট করেছে। এখানে বেশ কয়েকটি নাটক ও চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি আলাউদ্দিন সাজুর পরিচালনায় ‘সব সুখ তোর জন্য’ চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে জমিদার বাড়িতে। তরুণ নির্মাতা নিরব অধিকারীর কাছেও স্থানটি বিশেষ পছন্দের। তাঁর মতে, পুরোনো সময়ের গল্প কিংবা ভৌতিক ঘরানার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জমিদার বাড়িটির পরিবেশ বেশ উপযোগী। তিনি নিজেও এখানে ‘মৃত্যুরূপ’ ও ‘বিসর্জন’ নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক নির্মাণ করেছেন।
নিরব অধিকারীর মতে, পরিকল্পিত সংস্কারের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘি দেশের নির্মাতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় শুটিং লোকেশনে পরিণত হতে পারে।
সংস্কার ও সংরক্ষণে প্রশাসনের উদ্যোগ
দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘি সংস্কারের উদ্যোগ এর আগেও নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ বিষয়ে উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় একটি পক্ষের করা রিটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে জমিদার বাড়ি ও দিঘির জমি নিয়ে বিরোধ এবং ভোগদখলের অভিযোগও ছিল।
পরবর্তী সময়ে গত ২৯ আগস্ট আদালত জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘিসংক্রান্ত রিটটি খারিজ করে দেন। এরপর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্থাপনা দুটির সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়।
এদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করে। এতে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় স্থাপনাটিকে সংরক্ষণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পর্যটনকেন্দ্র গড়তে যা প্রয়োজন
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘিকে সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। তাঁদের মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্রামের জন্য সরকারি রেস্টহাউস নির্মাণ করা জরুরি।
পাশাপাশি খোয়া সাগর দিঘিতে নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থা করা গেলে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ আরও বাড়বে। পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই স্থান দুটি ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
কীভাবে যাবেন
লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে বাস বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দালাল বাজার যাওয়া যায়। দালাল বাজার থেকে প্রায় ২৫০ গজ পূর্বে ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের উত্তর পাশে খোয়া সাগর দিঘি। আর বাজার থেকে দক্ষিণ দিকে যাওয়ার প্রধান সড়কের পাশেই অবস্থিত পুরোনো জমিদার বাড়ি।
সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন করা গেলে দালাল বাজারের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্মীপুরের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে জায়গা দুটি স্থানীয় পর্যটনের পাশাপাশি দেশের ভ্রমণপ্রেমীদের কাছেও নতুন আগ্রহের কেন্দ্র হতে পারে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!