ছবির রঙে আরেক শিশুর পাশে আরিয়ান
আর দশটি শিশুর মতোই ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকার প্রতি বেশ ঝোঁক আরিয়ান সিরাজ মাহমুদের। একসময় দেয়াল ও খাতায় হিজিবিজি আঁকা দিয়েই শুরু হয়েছিল তার পথচলা। এখন সেই আঁকাআঁকিই হয়ে উঠেছে অন্য একটি শিশুর পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম।
আট বছর পেরোনো এই শিশুশিল্পীর ২০টি চিত্রকর্ম নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে একক প্রদর্শনী ‘ডুডলস অ্যান্ড ড্রিমস’। ২৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে আয়োজিত তিন দিনের এই প্রদর্শনী থেকে পাওয়া অর্থ ক্যানসারে আক্রান্ত একটি শিশুর চিকিৎসায় সহায়তা হিসেবে দেওয়া হবে।
আগা খান একাডেমির পঞ্চম গ্রেডের শিক্ষার্থী আরিয়ান সিরাজ মাহমুদ। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্ট (ব্যানকাট)।
রঙে রঙে নিজের এক পৃথিবী
‘ডুডলস অ্যান্ড ড্রিমস’ প্রদর্শনীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙিন সব ক্যানভাস। একটি টেবিলে সাজিয়ে রাখা ছিল আরিয়ানের আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম। পাশাপাশি তার আঁকা ছবি ব্যবহার করে তৈরি টি-শার্ট, মগ ও চাবির রিংও ছিল সেখানে।
তবে দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছিল আরিয়ানের পছন্দের কাল্পনিক ও সুপারহিরো চরিত্রগুলো। গডজিলা, ব্যাটম্যান, সুপারম্যানসহ নানা চরিত্রের পাশাপাশি নিজের কল্পনা থেকে তৈরি কিছু ডুডলও স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে।
আরিয়ানের কাছে ছবি আঁকা শুধু সময় কাটানোর বিষয় নয়। তার ভাষায়, আঁকাআঁকির মাধ্যমে এমন একটি জগৎ তৈরি করা যায়, যেটা পুরোপুরি নিজের। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা সীমারেখা নেই; নিজের ইচ্ছামতো সেই জগতের গল্প ও চরিত্র সাজিয়ে নেওয়া যায়।
শৈশবে দেয়াল ও খাতায় আঁকিবুঁকি দিয়ে শুরু হলেও এখন বিভিন্ন ক্যানভাসে নিজের কল্পনার জগৎ ফুটিয়ে তুলতে বেশি ভালোবাসে সে।
ভাবনাটা এল মায়ের কাছ থেকে
আরিয়ানের মা ও ‘ডুডলস অ্যান্ড ড্রিমস’–এর আয়োজক নিশাত হামিদ জানান, ছোটবেলা থেকেই ছেলের আঁকার প্রতি আগ্রহ তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে এমন কিছু করার ভাবনা থেকেই এই আয়োজনের শুরু।
নিশাতের ভাষায়, এমন একটি উদ্যোগ দরকার ছিল, যেখানে আরিয়ান নিজের সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি পাবে।
ক্যানসারে আক্রান্ত একটি শিশুর জন্য আয়োজনটির পুরো প্রক্রিয়াটিও তাই ছিল বিশেষ। শিল্পী একজন শিশু, প্রদর্শনীতে আসা অনেক দর্শক ও ক্রেতাও শিশু, আর সংগৃহীত অর্থ যাবে আরেক শিশুর চিকিৎসায়।
এক শিশুর জন্য আরেক শিশুর সহমর্মিতা
এই উদ্যোগকে শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরির একটি সুন্দর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্টের ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার আবু রায়হান।
তিনি মনে করেন, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি করা গেলে সমাজ আরও মানবিক হয়ে উঠবে। নিজের সৃষ্টিশীলতা ব্যবহার করে আরিয়ান যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে তিনি ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আরিয়ানের নিজের কাছেও পুরো বিষয়টি আনন্দের। নিজের আঁকা ছবি দিয়ে নিজেরই মতো আরেকটি শিশুর পাশে থাকতে পারার অনুভূতি কেমন—জানতে চাইলে সে বলে, বিষয়টি তার খুব ভালো লাগছে।
প্রদর্শনী থেকে উঠেছে ৩০ হাজার টাকা
তিন দিনের প্রদর্শনী থেকে মোট ৩০ হাজার টাকা সংগ্রহ হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিশাত হামিদ। এর সঙ্গে আরও কিছু অর্থ যোগ করে ব্যানকাটের তত্ত্বাবধানে ক্যানসার আক্রান্ত শিশু শোভার হাতে চিকিৎসা সহায়তা হিসেবে তুলে দেওয়া হবে।
একটি শিশুর আঁকা ছবি যখন আরেকটি শিশুর চিকিৎসার সহায়তা হয়ে ওঠে, তখন সেই ছবির মূল্য শুধু তার ক্যানভাসে থাকে না। সেখানে জড়িয়ে যায় সহমর্মিতা, সৃষ্টিশীলতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প।
আরিয়ানও জানিয়েছে, এখানেই থেমে থাকতে চায় না সে। সামনে নিজের আঁকাআঁকিকে কাজে লাগিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ আরও চালিয়ে যেতে চায় ছোট্ট এই শিল্পী।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!