জাপানে ‘মুকোয়োশি’ নামে এমন একটি প্রথা রয়েছে, যেখানে মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে পরিবারের ছেলে ও ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি করা হয়।
বিয়ের পর সাধারণত একজন পুরুষ স্ত্রীর পরিবারের জামাই হিসেবেই পরিচিত হন। কিন্তু জাপানে এমন একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আইনি প্রথা রয়েছে, যেখানে মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে পরিবারেরই ছেলে ও উত্তরসূরি করে নেওয়া হয়। ‘মুকোয়োশি’ নামে পরিচিত এই প্রথাকে সহজ ভাষায় বলা যায়, দত্তক ঘরজামাই।
বিষয়টি শুধু পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পারিবারিক পদবি, ব্যবসা, সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারের প্রশ্ন। বিশেষ করে কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে বা নিজেদের সন্তানকে পারিবারিক ব্যবসার উত্তরসূরি হিসেবে উপযুক্ত মনে না হলে এই প্রথার আশ্রয় নেওয়া হতে পারে।
দত্তক নেওয়া হয় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকেও
বিশ্বের অনেক দেশে দত্তক মানেই শিশুকে নতুন পরিবারে বড় করে তোলার বিষয়। জাপানের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা আলাদা। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকেও দত্তক নেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানে মোট দত্তকের বড় একটি অংশই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের নিয়ে। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের এভাবে পরিবারে নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা পরবর্তী সময়ে পরিবারের ব্যবসার দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
তবে এটি কেবল আবেগের সিদ্ধান্ত নয়। এর পেছনে থাকে পরিবার ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বাস্তব হিসাবও।
ছেলে নেই, তাই জামাইই উত্তরসূরি
জাপানের অনেক পুরোনো ব্যবসা এখনো পারিবারিক মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে কিংবা পরিবারের নিজের ছেলেকে ব্যবসার দায়িত্ব দেওয়ার মতো উপযুক্ত মনে না হলে বাইরে থেকে একজন যোগ্য পুরুষকে দত্তক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মেয়ের স্বামী যদি সেই পরিবারের পছন্দের ব্যক্তি হন, তাহলে তাঁকে বিয়ের পর দত্তক নেওয়া যেতে পারে। দত্তক সম্পন্ন হলে তিনি পরিবারের পদবি গ্রহণ করতে পারেন এবং পরিবারের ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি পান। ভবিষ্যতে ব্যবসা, সম্পদ ও উত্তরাধিকারও তাঁর হাতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থাৎ, সম্পর্কটি শুধু জামাইয়ের পরিচয়ে আটকে থাকে না। তিনি হয়ে উঠতে পারেন পরিবারের একজন পূর্ণ সদস্য এবং অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী কর্তা।
পদবি ও ব্যবসার ধারাবাহিকতা
‘মুকোয়োশি’ প্রথার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো পারিবারিক ধারাবাহিকতা। পরিবারের পদবি যেন হারিয়ে না যায়, পুরোনো ব্যবসা যেন বাইরের কারও হাতে চলে না যায় এবং প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যেন এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছায়—এই লক্ষ্যেই বহুদিন ধরে এ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
জাপানে ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের পর স্ত্রী স্বামীর পদবি গ্রহণ করেন। ফলে কোনো পরিবারে ছেলে না থাকলে পরিবারের পদবি ধরে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। মেয়ের স্বামীকে দত্তক নিয়ে তাঁকে পরিবারের পদবি দেওয়ার মাধ্যমে সেই সমস্যার একটি সমাধান করা হয়।
এভাবেই একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে জামাই, ছেলে, উত্তরসূরি এবং পরিবারের নাম বহনকারী হয়ে ওঠেন।
বড় বড় ব্যবসাতেও রয়েছে এর নজির
জাপানের ব্যবসায়িক ইতিহাসেও ‘মুকোয়োশি’র উপস্থিতি দেখা যায়। সুজুকি মোটর করপোরেশনের নেতৃত্বে একাধিকবার দত্তক পুত্রের আগমন ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের প্রধান ওসামু সুজুকিও এই প্রথার মাধ্যমে পরিবারে আসা একজন দত্তক ঘরজামাই ছিলেন।
নিনটেনডো, কিক্কোমান ও টয়োটার মতো জাপানি প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গেও বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের প্রথার সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে।
ফলে কিছু বিখ্যাত জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে পারিবারিক মালিকানা ও নেতৃত্ব ধরে রাখতে যে উত্তরাধিকার কৌশল অনুসরণ করেছে, তার পেছনেও ‘মুকোয়োশি’র ভূমিকা ছিল বলে বিবেচনা করা হয়।
শুধু ব্যবসা নয়, সম্পদের উত্তরাধিকারেও
‘মুকোয়োশি’ কেবল পারিবারিক ব্যবসা টিকিয়ে রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিঃসন্তান কোনো দম্পতি ভবিষ্যতে তাঁদের সম্পদ ও পারিবারিক দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিশ্চিত করতেও প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে দত্তক নিতে পারেন।
দত্তক প্রক্রিয়া জাপানের সরকারি পারিবারিক নথি ‘কোসেকি’-তে নিবন্ধিত হয়। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর দত্তক নেওয়া ব্যক্তি নতুন পরিবারের পদবি গ্রহণ করতে পারেন এবং জন্মসন্তানের মতোই পারিবারিক দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার পাওয়ার অধিকার অর্জন করেন।
এর সঙ্গে পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের দেখাশোনা ও অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্বও যুক্ত হতে পারে।
বিদেশিরাও কি হতে পারেন ‘মুকোয়োশি’?
এই প্রথা নিয়ে সবচেয়ে কৌতূহলের প্রশ্নগুলোর একটি হলো—জাপানের বাইরের কোনো দেশের নাগরিক কি এমনভাবে একটি জাপানি পরিবারের সদস্য হতে পারেন?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের অনুমতি থাকা বিদেশিরাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দত্তক হতে পারেন। কিছু পরিস্থিতিতে এ জন্য আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো বাংলাদেশি ব্যক্তি নির্ধারিত আইনি শর্ত পূরণ করলে জাপানি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক দত্তক সন্তান হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। তবে দত্তক গ্রহণের সঙ্গে জাপানের নাগরিকত্ব বা ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। এসবের জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
জন্মহার কমায় কেন আবার আলোচনায় ‘মুকোয়োশি’?
আধুনিক জাপানে জন্মহার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবারের সন্তান থাকলেও ছেলে নেই। আবার সন্তান থাকলেও সবাই পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত হতে চান না বা ব্যবসা পরিচালনার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারেন।
তখন প্রশ্ন ওঠে—দীর্ঘদিনের ব্যবসা বা পারিবারিক প্রতিষ্ঠান কে চালাবেন?
এই পরিস্থিতিতে কোনো কোনো পরিবার উপযুক্ত একজন জামাইকেই ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেয়। এমনকি উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে দেওয়ার জন্য জাপানে বিশেষ ম্যাচমেকিং সেবারও অস্তিত্ব রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ নিয়ে একটি প্রচলিত জাপানি কথাও আছে—‘ছেলে তুমি বেছে নিতে পারো না, কিন্তু জামাই বেছে নিতে পারো।’
বদলে যাওয়া সমাজে পুরোনো প্রথা
সময় বদলেছে, বদলেছে জাপানি সমাজও। এখন নারীরাও ব্যবসা, রাষ্ট্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ফলে পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে শুধু একজন পুরুষকেই বেছে নেওয়ার পুরোনো ধারণা কতটা প্রয়োজনীয়, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
তারপরও ‘মুকোয়োশি’ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
কারও কাছে এটি একজন জামাইকে পরিবারের ছেলে করে নেওয়ার রীতি। কারও কাছে শত বছরের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার বাস্তব কৌশল। আবার কারও কাছে এটি পারিবারিক পদবি, সম্পদ ও উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক ব্যবস্থা।
জাপানের ‘মুকোয়োশি’ তাই শুধু দত্তক নেওয়ার গল্প নয়। এর মধ্যে একই সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিয়ে, পরিবার, ব্যবসা, উত্তরাধিকার, সামাজিক মূল্যবোধ এবং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জাপানের ছবি।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!