ট্রাফিক সামলাচ্ছে ‘রোবোকপ’, চীনে নিয়ম ভাঙা কমেছে ৪০ শতাংশ
ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি এবার ব্যস্ত সড়কের দায়িত্ব সামলাচ্ছে রোবট। চীনের পূর্বাঞ্চলীয় ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ ধরনের ট্রাফিক রোবট। দেখতে অনেকটা সিনেমার ‘রোবোকপ’-এর মতো হলেও অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, বরং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও পথচারীদের সতর্ক করাই এর প্রধান কাজ।
প্রায় ১.৮৮ মিটার উচ্চতার এবং ৯৮ কেজি ওজনের এই চালকহীন রোবটকে তৈরি করেছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সুপকন ইনফরমেশন। ‘টি-টু’ মডেলের এই রোবটের মাধ্যমে পুলিশের নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের চাপ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কী কী কাজ করছে রোবট?
ক্যামেরা, রাডার এবং উন্নত কম্পিউটিং ব্যবস্থার সাহায্যে রোবটটি রাস্তায় বিভিন্ন ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হেলমেট ছাড়া ই-বাইক চালানো, একটি ই-বাইকে অতিরিক্ত আরোহী থাকা, স্টপলাইন অতিক্রম করে গাড়ি দাঁড় করানো এবং ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে রাস্তা পার হওয়ার মতো ঘটনা।
আইন ভাঙা দেখলে রোবট শুধু শনাক্তই করছে না, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মৌখিকভাবে সতর্কও করছে। ট্রাফিক সিগন্যালের সঙ্গে সমন্বয় করে যান্ত্রিক হাতের সাহায্যে পেশাদার ট্রাফিক পুলিশের মতো সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে এতে।
১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে সতর্ক
সুপকনের দাবি, হাংচৌ শহরের বিভিন্ন সড়কে গত মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত ১৫টি এমন রোবট মোতায়েন করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে রোবটগুলো ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষকে মৌখিক সতর্কবার্তা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, রোবট ব্যবহারের পর হেলমেট ছাড়া ই-বাইক চালানো এবং স্টপলাইন অতিক্রমের মতো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা মাসিক হিসাবে ৪০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে হাংচৌ ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
শুধু ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নয়
রোবটটির কাজ কেবল যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটক বা পথচারীরা রাস্তার দিকনির্দেশনা, পার্কিং কিংবা ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানতে চাইলে তাদের তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ ছাড়া কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার বিশেষ সুবিধা রয়েছে। রোবটের সাতটি জোড়াযুক্ত হাতের মাধ্যমে ট্রাফিক পুলিশের বিভিন্ন সংকেত অনুকরণ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।
প্রতিকূল আবহাওয়াতেও চলছে পরীক্ষা
সুপকনের তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন এলাকা, স্কুল জোন, বাণিজ্যিক এলাকা এবং ব্যস্ত সময়ে রোবটগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা করা হয়েছে। তীব্র রোদ, ভারী বৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ক্যামেরা ও রাডারের কার্যক্ষমতা কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিভিন্ন পরিস্থিতিতেও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার ক্ষেত্রে রোবটের সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশের বেশি।
নির্মাতাদের মতে, মূল উদ্দেশ্য জরিমানা করা নয়; বরং কেউ নিয়ম ভাঙার পর তা অভ্যাসে পরিণত হওয়ার আগেই তাকে সতর্ক করা। মানুষের মতো ক্লান্ত না হওয়ায় রোবটগুলো দীর্ঘ সময় একটানা দায়িত্ব পালন করতে পারে।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় দায়িত্ব
বর্তমানে রোবটগুলো সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট সিগন্যাল এলাকায় কাজ করছে। এর জন্য আলাদা রিমোট কন্ট্রোলের প্রয়োজন হয় না। একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যরা রোবটগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালনা করতে পারেন।
সুপকনের দাবি, চীনের তিনটি প্রদেশের প্রায় আটটি শহরে বর্তমানে প্রায় ৫০টি ট্রাফিক রোবট কাজ করছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ২০০-তে পৌঁছানোর আশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিদেশে রফতানির সম্ভাবনা, তবে রয়েছে চ্যালেঞ্জ
চীনের প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও এই ধরনের রোবটকে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়ার সম্ভাবনা দেখছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রচণ্ড গরম কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দীর্ঘস্থায়ী বর্ষার মতো প্রতিকূল পরিবেশে পুলিশের সহায়ক হিসেবে এসব রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিদেশে এ ধরনের প্রযুক্তি চালু করা সহজ নয়। কারণ ট্রাফিক রোবটে ক্যামেরা ও বিভিন্ন সংবেদনশীল সেন্সর ব্যবহার করা হয়। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সনদ এবং তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা আইন মেনে চলার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, চীনের রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রোবটের ব্যবহার ভবিষ্যতের নগর ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ভূমিকা কতটা বাড়তে পারে, তার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!