Dark Mode
Image
  • Thursday, 15 October 2026
পুরোনো বই কিনছে কারা? রহস্যের কেন্দ্রে এআই

পুরোনো বই কিনছে কারা? রহস্যের কেন্দ্রে এআই

পুরোনো বইয়ের বাজারে হঠাৎ করেই দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক চাহিদা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বই বিক্রেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি না হওয়া বইও এখন একসঙ্গে বড় পরিমাণে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কোথাও হাজার হাজার উপন্যাস পাঠানো হচ্ছে দূরবর্তী গুদামে। কিন্তু এসব বই শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে, আর কেনই বা এত পুরোনো বই কেনা হচ্ছে—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে কৌতূহল ও উদ্বেগ।

বই বিক্রেতাদের একটি বড় অংশের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান চাহিদা। এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বই ও লিখিত তথ্য প্রয়োজন হওয়ায় পুরোনো বইয়ের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক দিনের অর্ডারেই সপ্তাহের বিক্রি

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নর্থাম্বারল্যান্ডের বার্টার বুকসের মালিক স্টুয়ার্ট ম্যানলি সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিন হাজার পুরোনো বই বিক্রি করেন। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি এমন বড় একটি অর্ডার পেয়েছেন, যা তাঁর স্বাভাবিক সাত দিনের বিক্রিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

প্রায় তিন দশক ধরে পুরোনো বইয়ের ব্যবসায় থাকা ম্যানলির ভাষ্য, এমন ঘটনা তিনি আগে কখনো দেখেননি। শুধু তাঁর দোকানেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার পুরোনো বই বিক্রেতারাও একই ধরনের অস্বাভাবিক চাহিদার কথা জানাচ্ছেন।

সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—বিক্রি হওয়া বইগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে, তা অনেক বিক্রেতাই জানেন না।

বই কি পাঠকের হাতে যাচ্ছে, নাকি এআইয়ের কাছে?

বিক্রির ধরন দেখে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এসব বই সাধারণ পাঠকের জন্য কেনা হচ্ছে না। বরং এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বইয়ের তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে।

বিশেষ করে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বইয়ের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। দুর্লভ লাতিন ভাষার বই থেকে শুরু করে কাউবয় উপন্যাস—বিভিন্ন ঘরানার বইও হঠাৎ বিক্রি হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় বা লেখকের বইয়ের প্রতি একক আগ্রহ না থাকায় এটি এআই প্রশিক্ষণের ডেটা সংগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এআই প্রশিক্ষণের জন্য বই কেনা নিয়ে আইনি বিতর্ক

এআই মডেল প্রশিক্ষণে বই ব্যবহারের বিষয়টি ইতোমধ্যে আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের বিরুদ্ধে কয়েকজন লেখক মামলা করেছিলেন। ২০২৫ সালের ওই মামলার রায়ে বিচারক উইলিয়াম অ্যালসাপ এআই প্রশিক্ষণের জন্য বিপুলসংখ্যক বই কেনার বিষয়টিকে অবৈধ বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেননি।

পরবর্তীতে আদালতের নথিপত্র প্রকাশ্যে এলে জানা যায়, অ্যান্থ্রপিকের এআই চ্যাটবট ক্লডকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিপুলসংখ্যক পুরোনো বই সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব বই ডিজিটালভাবে স্ক্যান করার পর কিছু ক্ষেত্রে ধ্বংস করে ফেলার বিষয়টিও নথিতে উঠে আসে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, এআই প্রশিক্ষণে উন্মুক্ত ওয়েব ডেটা, বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত ডেটাসেট এবং নিজেদের তৈরি ডেটাসহ বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করা হয়। তাদের দাবি, ডেটা সংগ্রহের কর্মসূচিতে বিরল বা সহজে পাওয়া যায় না—এমন বই কিনে ধ্বংস করা হয় না।

‘ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং’ নিয়ে উদ্বেগ

এআই প্রশিক্ষণের জন্য পুরোনো বইকে ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তরের একটি পদ্ধতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘ডেস্ট্রাকটিভ স্ক্যানিং’ বা ধ্বংসাত্মক স্ক্যানিং।

এই প্রক্রিয়ায় বইয়ের বাঁধাই খুলে প্রতিটি পৃষ্ঠা দ্রুত স্ক্যান করা হয়। ফলে বইটি আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। ডিজিটাল কপি তৈরি হলেও মূল বইটি হারিয়ে যায়।

আদালতের নথিতে অ্যান্থ্রপিকের একটি প্রকল্পকে ‘পানামা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক বই স্ক্যান করে ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে।

সব পুরোনো বই কি সংরক্ষণ করা জরুরি?

বিষয়টি নিয়ে বই বিক্রেতা ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সব বইয়ের প্রতিটি কপি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। কোনো বইয়ের হাজার হাজার কপি লাইব্রেরি বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকলে একটি কপি নষ্ট হওয়ায় হয়তো বড় ধরনের ক্ষতি হবে না।

কিন্তু কোনো দুর্লভ বইয়ের যদি হাতে গোনা কয়েকটি কপি থাকে, কিংবা কোনো বইয়ের মাত্র একটি কপি সংরক্ষিত থাকে, তাহলে সেটি শুধু স্ক্যান করার জন্য ধ্বংস করা হলে ভবিষ্যতের জন্য তা বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণেই পুরোনো বইয়ের অস্বাভাবিক চাহিদার পাশাপাশি সেগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কপিরাইট নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন

এআই প্রশিক্ষণে বইয়ের লেখা ব্যবহার করা কতটা বৈধ, তা নিয়েও দেশভেদে আইন আলাদা। বিশেষজ্ঞদের মতে, বই স্ক্যান করে এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কপিরাইট মালিকের অধিকার এবং অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে এআইয়ের জন্য পুরোনো বই সংগ্রহের এই নতুন প্রবণতা শুধু বইয়ের বাজারকেই বদলে দিচ্ছে না; একই সঙ্গে কপিরাইট, তথ্যের মালিকানা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই থেকে যাচ্ছে—এআইয়ের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করতে গিয়ে আমরা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি পুরোনো বইয়ের আসল কাগজের ইতিহাস?

Comment / Reply From