Dark Mode
Image
  • Thursday, 15 October 2026
ডুমস্ক্রলিং ছাড়ুন, ব্লুমস্ক্রলিংয়ে ফিরুক স্বস্তি

ডুমস্ক্রলিং ছাড়ুন, ব্লুমস্ক্রলিংয়ে ফিরুক স্বস্তি

অবসরে, কাজের ফাঁকে কিংবা একঘেয়েমি কাটাতে হাতে ফোন তুলে নেওয়া এখন দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো মজার ভিডিও, কখনো অনুপ্রেরণামূলক গল্প, আবার কখনো উদ্বেগ বাড়ানো খবর দেখতে দেখতে কেটে যায় অনেকটা সময়। কিন্তু পর্দায় যা দেখছি, তা আমাদের মনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেদিকে কি খেয়াল রাখি?

একটির পর একটি নেতিবাচক খবর, দুর্ঘটনা, সংঘাত কিংবা দুশ্চিন্তা তৈরি করা কনটেন্ট দেখতে থাকলে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে। এ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং কী দেখছি, কতক্ষণ দেখছি এবং তা আমাদের কেমন অনুভব করাচ্ছে—এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

মন ভালো করা, আনন্দদায়ক ও অনুপ্রেরণামূলক কনটেন্ট বেছে দেখার এমন অভ্যাসকেই বলা হচ্ছে ‘ব্লুমস্ক্রলিং’। <Cite refs={["turn862260news24","turn862260search4"]}/>

ব্লুমস্ক্রলিং কী?

‘ব্লুমস্ক্রলিং’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘ব্লুম’ ও ‘স্ক্রলিং’ থেকে। এর মূল ধারণা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলোমেলোভাবে সব ধরনের কনটেন্ট দেখার পরিবর্তে সচেতনভাবে এমন বিষয় খুঁজে নেওয়া, যা আনন্দ দেয়, নতুন কিছু শেখায় কিংবা মনে ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে।

প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রাণীদের মজার কর্মকাণ্ড, মানুষের ভালো কাজের গল্প, ভ্রমণ, রান্না, শিল্পচর্চা কিংবা নিজের পছন্দের কোনো শখ নিয়ে ভিডিও—এসব হতে পারে ব্লুমস্ক্রলিংয়ের অংশ।

মার্কিন স্নায়ুমনোবিজ্ঞানী ডা. সানাম হাফিজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অনলাইনে ভালো অনুভূতি তৈরি করে এমন বিষয় ইচ্ছাকৃতভাবে দেখাই ব্লুমস্ক্রলিংয়ের মূল কথা। অর্থাৎ ফোন খুলে সামনে যা আসে, তা নির্বিচারে দেখার বদলে নিজের ভালো লাগা ও মানসিক স্বস্তিকে গুরুত্ব দেওয়া।

তবে এর অর্থ বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো এড়িয়ে চলা নয়। প্রয়োজনীয় খবর জানা, সমস্যা সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং একই সঙ্গে মন ভালো রাখে এমন কনটেন্টের জন্য জায়গা তৈরি করাই এর লক্ষ্য। <Cite refs={["turn862260news24","turn862260search0"]}/>

কেন বাড়ে ডুমস্ক্রলিংয়ের প্রবণতা?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উদ্বেগজনক খবর দেখার পর একই ধরনের আরও খবর সামনে আসতে পারে। এরপর নতুন কোনো ঘটনা জানার কৌতূহল কিংবা পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ থাকার তাগিদে ব্যবহারকারী বারবার পর্দায় ফিরে যান। কখনো কখনো এভাবে দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও থামতে ইচ্ছা করে না।

নেতিবাচক বা উদ্বেগ সৃষ্টিকারী খবর একের পর এক দেখতে থাকার এই অভ্যাসকে বলা হয় ‘ডুমস্ক্রলিং’।

এ ধরনের অভ্যাসের সঙ্গে উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং কম মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালে Frontiers in Psychology সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণেও ডুমস্ক্রলিংয়ের সঙ্গে উদ্বেগ, বিষণ্নতার উপসর্গ ও মানসিক অস্বস্তির সম্পর্ক উঠে এসেছে। তবে গবেষণাগুলোর প্রমাণের নিশ্চয়তা সীমিত ছিল। তাই ডুমস্ক্রলিং সরাসরি এসব সমস্যার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। <Cite refs={["turn425779search0","turn425779search1"]}/>

বিশেষ করে কোনো খারাপ খবর দেখার পর সেটি নিয়ে বারবার চিন্তা করা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা নতুন কোনো বিপদের খবর এসেছে কি না, তা দেখার জন্য ঘন ঘন ফোন পরীক্ষা করার অভ্যাস মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। ফোন সরিয়ে রাখার পরও সেই চিন্তা মাথায় ঘুরতে থাকলে স্বাভাবিক কাজকর্মে মনোযোগ দেওয়াও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ইতিবাচক কনটেন্ট কি মন ভালো রাখতে পারে?

একই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন উদ্বেগ বাড়ানো খবর রয়েছে, তেমনি রয়েছে আনন্দদায়ক ও শিক্ষণীয় নানা বিষয়। মানুষের সহযোগিতা, বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ানো কিংবা কারও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে সফল হওয়ার গল্প মন ভালো করতে পারে। প্রকৃতি কিংবা প্রাণীদের ভিডিওও অনেকের জন্য হতে পারে সাময়িক স্বস্তির উৎস।

ব্লুমস্ক্রলিংয়ের ধারণা হলো, এমন কনটেন্ট সচেতনভাবে বেছে নিয়ে অনলাইনে নিজের অভিজ্ঞতাকে আরও ইতিবাচক করা।

এ ক্ষেত্রে অক্সিটোসিন ও ডোপামিনের মতো মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদানের প্রসঙ্গও আলোচনায় আসে। তবে নির্দিষ্ট ধরনের ভিডিও দেখলেই এসব রাসায়নিকের নিঃসরণ বাড়বে বা মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। বরং ইতিবাচক কনটেন্ট দেখার পর নিজের অনুভূতি কেমন হচ্ছে, সেটি লক্ষ করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দেওয়াই কি একমাত্র উপায়?

কাজ, পড়াশোনা, খবর সংগ্রহ এবং যোগাযোগের জন্য অনেকেরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রয়োজন। ফলে সব ধরনের ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। আবার প্রয়োজনের বাইরে দীর্ঘ সময় ধরে পর্দায় আটকে থাকাও মানসিক ক্লান্তির কারণ হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে ব্যবহারের ধরন বদলে দেখা যেতে পারে। কোন কনটেন্টের পর মন খারাপ হচ্ছে, কোনটি অযথা দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে এবং কোনটি আনন্দ দিচ্ছে—এসবের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।

নিজের অনুভূতি বুঝতে পারলে অনলাইনে কী দেখবেন, সে বিষয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। এতে তথ্য জানার প্রয়োজনও পূরণ করা যায়, আবার অপ্রয়োজনীয় নেতিবাচক কনটেন্টের পেছনে সময় ব্যয় কমানোর সুযোগও তৈরি হয়।

নিজের নিউজফিড সাজাবেন যেভাবে

ব্লুমস্ক্রলিংয়ের চর্চা শুরু করতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু সাধারণ সুবিধাই কাজে লাগানো যায়।

যেসব পেজ বা অ্যাকাউন্টের কনটেন্ট বারবার উদ্বেগ, বিরক্তি কিংবা মন খারাপের কারণ হয়, সেগুলো আনফলো বা মিউট করা যেতে পারে। কোনো পোস্ট আর দেখতে না চাইলে ‘নট ইন্টারেস্টেড’ ধরনের অপশন ব্যবহার করা যায়। অন্যদিকে নিজের পছন্দের বিষয়, শিক্ষামূলক কনটেন্ট, সৃজনশীল কাজ কিংবা অনুপ্রেরণামূলক গল্প প্রকাশ করেন—এমন অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করা যেতে পারে।

পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালু হওয়ার সুবিধা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক করাও সহায়ক হতে পারে। কখন ফোন সরিয়ে রাখতে হবে, সেই সীমা নির্ধারণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। <Cite refs={["turn862260news24","turn425779search9"]}/>

তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ইতিবাচক কনটেন্ট দেখার অভ্যাস বাস্তব জীবনের সম্পর্ক, বিশ্রাম কিংবা প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়। অনলাইনে আনন্দদায়ক কিছু দেখার পরও যদি দীর্ঘদিন মন খারাপ, উদ্বেগ বা মানসিক ক্লান্তি থেকে যায়, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

দিনের শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের সময়ের একটি অংশ। সেই সময়ে শুধু উদ্বেগ আর অস্থিরতা জমা না করে নতুন কিছু শেখা, ভালো লাগার মুহূর্ত খুঁজে নেওয়া কিংবা মনকে একটু স্বস্তি দেওয়ার সুযোগও রাখা যায়। লক্ষ্য শুধু বেশি সময় স্ক্রল করা নয়, বরং কী দেখছি এবং তা আমাদের কেমন অনুভব করাচ্ছে—সেটি বুঝে অনলাইনে সময় কাটানো।

Comment / Reply From