Dark Mode
Image
  • Wednesday, 04 November 2026
দুই হাতের সীমাবদ্ধতা জয় করে রায়হানের নতুন স্বপ্ন

দুই হাতের সীমাবদ্ধতা জয় করে রায়হানের নতুন স্বপ্ন

দুই হাতের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে উচ্চশিক্ষার পথে রায়হান, এবার স্বপ্ন একটি চাকরির

জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন। শৈশবে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন দুই হাতের স্বাভাবিক সক্ষমতা। জীবনের শুরুতেই একের পর এক প্রতিকূলতা এলেও থেমে যাননি কক্সবাজারের চকরিয়ার বাহার উদ্দিন রায়হান। হাতের বদলে কনুই ও মুখের সাহায্যে লিখে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন প্রথম শ্রেণিতে। এখন তাঁর লক্ষ্য চাকরির মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের জন্য আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া।

দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় হাত, থামাতে পারেনি স্বপ্ন

রায়হানের জন্মের আগেই মারা যান তাঁর বাবা। মায়ের স্নেহে বেড়ে ওঠা শৈশবেই এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হন তিনি। বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমারে হাত দেওয়ার ফলে একটি হাত এবং অন্য হাতের কনুই পর্যন্ত অংশ হারাতে হয় তাঁকে। কয়েক মাস চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ফিরে যান নিজ এলাকা কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার জহিরপাড়া গ্রামে।

দুই হাতের স্বাভাবিক ব্যবহার হারানোর পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে হাল ছাড়েননি রায়হান। মামাদের অনুপ্রেরণা আর নিজের দৃঢ় মনোবলকে সঙ্গী করে আবারও পড়ার টেবিলে ফেরেন। হাতের বদলে কনুই ও মুখের সাহায্যে লিখে চালিয়ে যান শিক্ষাজীবন।

ধাপে ধাপে এগিয়ে উচ্চশিক্ষার পথে

চকরিয়ার আল রায়েদ একাডেমি থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন রায়হান। ২০০৮ সালে ভর্তি হন চকরিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে ৩.৪১ জিপিএ পেয়ে এসএসসি পাস করেন।

পরে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিক বিভাগে চকরিয়া কলেজে ভর্তি হন। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় পড়াশোনার খরচ চালিয়ে ২০১৬ সালে ২.৩৩ জিপিএ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

এরপর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। সেখান থেকে ২.৮৩ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করেন। সম্প্রতি স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় ৩.১৩ সিজিপিএ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

পড়াশোনার পাশাপাশি গড়েছেন কাজের অভিজ্ঞতা

শুধু শিক্ষাজীবনেই নয়, পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছেন রায়হান। দেশের প্রথম অ্যাপভিত্তিক অনলাইন রেস্টুরেন্ট ‘খাবার লাগবে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ ছাড়া যাতায়াতসংক্রান্ত তথ্যের জন্য তৈরি করেছেন ‘কেমনেযাব ডটকম’ (kemnejabo.com) নামে একটি ওয়েবসাইট।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিজের খরচ চালানোর জন্যও বিভিন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি মায়ের দেখভালের দায়িত্বও পালন করেছেন। রায়হানের ভাষ্য, তাঁর এই পর্যন্ত আসার পেছনে নানাবাড়ির অবদান সবচেয়ে বেশি। নানা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মানসিক সমর্থনের পাশাপাশি আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করেছেন।

যোগ্যতা আছে, অপেক্ষা শুধু একটি সুযোগের

শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ করে এখন চাকরির খোঁজ করছেন রায়হান। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। তাঁর দাবি, ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করলেও এখনো কোনো চাকরি পাননি। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকেও তাঁর একটি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

রায়হানের মতে, শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও চাকরির ক্ষেত্রে তাঁকে পিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মতো দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান সুযোগ দিলে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি।

জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়েছেন রায়হান। এখন তাঁর প্রত্যাশা, শারীরিক সীমাবদ্ধতার বদলে তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে নিয়োগদাতারা। একটি উপযুক্ত সুযোগই পারে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের পরের অধ্যায়কে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিতে।

 

Comment / Reply From