Dark Mode
Image
  • Sunday, 26 April 2026
জিন সব সময় কাজ করে না কেন: বিজ্ঞানের এক নিঃশব্দ বিপ্লবের গল্প

জিন সব সময় কাজ করে না কেন: বিজ্ঞানের এক নিঃশব্দ বিপ্লবের গল্প

জীবনের মূল নকশা বহন করে ডিএনএ—এই সত্য আজ সবার জানা। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে: যদি শরীরের প্রতিটি কোষে একই ডিএনএ থাকে, তাহলে সব কোষ এক রকম কাজ করে না কেন? চোখ, যকৃত বা ত্বকের কোষ আলাদা আলাদা কাজ করে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই জন্ম নেয় জিন নিয়ন্ত্রণ বা জেনেটিক রেগুলেশনের ধারণা।

ডিএনএর ভেতরের শৃঙ্খলা থেকে নতুন প্রশ্ন

১৯৪০-এর দশকে Erwin Chargaff দেখান, ডিএনএ-তে অ্যাডেনিন (A) ও থাইমিন (T), এবং গুয়ানিন (G) ও সাইটোসিন (C) সমান অনুপাতে থাকে। এতে স্পষ্ট হয়, ডিএনএ এলোমেলো নয়—এতে রয়েছে নিখুঁত গাণিতিক শৃঙ্খলা।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন উঠল—এই তথ্য কোষ ব্যবহার করে কীভাবে? কখন কোন জিন কাজ করবে, তা নির্ধারণ করে কে?

পাস্তুর ইনস্টিটিউটে শুরু নতুন অনুসন্ধান

ফ্রান্সের Pasteur Institute-এ এই প্রশ্ন নিয়ে কাজ শুরু করেন দুই বিজ্ঞানী Jacques MonodFrançois Jacob। যুদ্ধোত্তর সময়ের কঠিন বাস্তবতা পেরিয়ে তাঁরা বুঝতে চান—জীবন কি কেবল রাসায়নিক বিক্রিয়া, নাকি এর পেছনে আছে সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা?

ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া, বিশাল আবিষ্কার

তাঁরা গবেষণার জন্য বেছে নেন একটি সাধারণ ব্যাকটেরিয়া—Escherichia coli। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই ব্যাকটেরিয়া পরিবেশ অনুযায়ী আচরণ বদলায়।
যখন ল্যাকটোজ থাকে, তখন এটি ল্যাকটোজ ভাঙার এনজাইম তৈরি করে। কিন্তু ল্যাকটোজ না থাকলে সেই এনজাইম আর তৈরি হয় না।

এ থেকেই জন্ম নেয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জিন কি নিজের মতো কাজ করে, নাকি কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ করে?

‘পাজামো এক্সপেরিমেন্ট’: প্রথম প্রমাণ

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে Arthur Pardee-কে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা একটি বিখ্যাত পরীক্ষা করেন, যা ‘পাজামো এক্সপেরিমেন্ট’ নামে পরিচিত (Pardee–Jacob–Monod)।
এই পরীক্ষায় প্রমাণ হয়—জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। একটি বিশেষ ‘i জিন’ এমন একটি প্রোটিন তৈরি করে, যা জিনের কাজ বন্ধ রাখতে পারে।

রিপ্রেসার: জিনের প্রহরী

এই নিয়ন্ত্রণকারী প্রোটিনকে বলা হয় রিপ্রেসার। এটি জিনের সামনে বসে পাহারা দেয়।

  • প্রয়োজন না থাকলে → জিন বন্ধ
  • প্রয়োজন হলে → রিপ্রেসার সরে যায়, জিন চালু হয়

অর্থাৎ, জিনেরও আছে ‘অন-অফ’ সুইচ।

অপেরন মডেল: জিনের সংগঠিত ব্যবস্থা

এই গবেষণা থেকেই জন্ম নেয় Operon model
এখানে জিন একা কাজ করে না; বরং একটি সম্পূর্ণ সিস্টেমের অংশ—

  • প্রোমোটার (শুরু করার জায়গা)
  • অপারেটর (নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল)
  • নিয়ন্ত্রণকারী জিন

সব মিলিয়ে এটি এক সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

mRNA: বার্তাবাহকের আবিষ্কার

পরবর্তীতে Sydney Brenner, François JacobMatthew Meselson প্রমাণ করেন, ডিএনএ থেকে তথ্য বহন করে নিয়ে যায় একটি অণু—messenger RNA
এই mRNA-ই প্রোটিন তৈরির নির্দেশ কোষের কারখানায় পৌঁছে দেয়।

কেন জিন সব সময় কাজ করে না?

এখন উত্তরটি পরিষ্কার—
জিন সব সময় সক্রিয় থাকে না, কারণ:

  • কোষের প্রয়োজন অনুযায়ী জিন চালু বা বন্ধ হয়
  • পরিবেশের পরিবর্তন জিনের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে
  • বিশেষ প্রোটিন (রিপ্রেসার) জিনকে থামিয়ে রাখতে পারে

বিজ্ঞানে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

এই আবিষ্কার জীববিজ্ঞানে এক বিপ্লব এনে দেয়। আগে প্রশ্ন ছিল—“জিনে কী লেখা আছে?”
এখন প্রশ্ন—“কখন কোন জিন কাজ করবে?”

১৯৬৫ সালে এই আবিষ্কারের জন্য Jacques Monod, François Jacob এবং André Lwoff নোবেল পুরস্কার পান।

শেষ কথা

জিন কোনো স্থির নির্দেশ নয়; এটি এক গতিশীল ব্যবস্থা। প্রয়োজন অনুযায়ী চালু হয়, আবার থেমেও যায়। এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই জীবনের বৈচিত্র্য, বিকাশ এবং টিকে থাকার মূল রহস্য।

Comment / Reply From