সেলফির ছবিতে কি চুরি হতে পারে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট?
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, প্রিয় দলের জয় কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল—খুশির মুহূর্তগুলোতে ‘ভিক্টরি’ বা ‘লাইক’ সাইন দিয়ে ছবি তোলা এখন খুবই সাধারণ ব্যাপার। এরপর সেই ছবি মুহূর্তেই জায়গা করে নেয় ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে। কিন্তু এই সাধারণ অভ্যাসই কি আপনার বায়োমেট্রিক তথ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে?
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে যে, হাই-রেজল্যুশনের ছবি থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে পারে সাইবার অপরাধীরা। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে—আসলেই কি একটি সেলফি থেকে আঙুলের ছাপ চুরি সম্ভব?
ছবি থেকে কি সত্যিই ফিঙ্গারপ্রিন্ট চুরি করা যায়?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, তাত্ত্বিকভাবে এটি সম্ভব। যদি খুব কাছ থেকে তোলা উচ্চমানের কোনো ছবিতে আঙুলের রেখাগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তাহলে উন্নত এআই প্রযুক্তি ও ইমেজ প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ব্যাস শেখরের ভাষায়, বিষয়টি সিনেমার গল্পের মতো শোনালেও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এটি পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
কীভাবে শুরু হলো এই আলোচনা?
সম্প্রতি চীনের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দেখানো হয়, ক্যামেরার খুব কাছে আঙুল রেখে ‘ভিক্টরি’ সাইন দিয়ে ছবি তুললে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই আঙুলের ছাপ ডিজিটালি বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে।
এরপর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
অতীতেও মিলেছে এমন নজির
২০১৪ সালে এক হ্যাকার দাবি করেছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে তোলা একটি ক্লোজ-আপ ছবি ব্যবহার করে তিনি সে সময়ের জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী উরসুলা ফন ডার লিয়েনের ফিঙ্গারপ্রিন্টের প্রতিরূপ তৈরি করেছিলেন।
একই বছরে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ক্রাকেনের নিরাপত্তা গবেষকরাও ছবি ও থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি করে দেখিয়েছিলেন।
সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কতটা?
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ ব্যবহারকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি ছবি থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও সেটিকে ব্যবহার করে ফোন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে আরও অনেক জটিল ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জাস্টিন ক্যাপোসের মতে, একজন সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এমন হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বরং ফিশিং লিংক, ভুয়া ইমেইল কিংবা প্রতারণামূলক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তথ্য চুরির ঝুঁকিই বেশি।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী, নিরাপত্তা সংস্থার সদস্য বা যাদের বায়োমেট্রিক তথ্য অত্যন্ত মূল্যবান—তারাই মূলত এমন আক্রমণের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন।
সাধারণ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে এই ধরনের জটিল সাইবার হামলা এখনো খুবই বিরল।
নিজেকে নিরাপদ রাখবেন যেভাবে
১. টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করুন
ফিঙ্গারপ্রিন্ট নকল হলেও অতিরিক্ত ওটিপি বা সিকিউরিটি কোড ছাড়া কেউ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পারবে না।
২. অথেন্টিকেটর অ্যাপ ব্যবহার করুন
গুগল অথেন্টিকেটর বা মাইক্রোসফট অথেন্টিকেটরের মতো অ্যাপ প্রতি ৩০ সেকেন্ডে নতুন কোড তৈরি করে, যা নিরাপত্তা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
৩. মাল্টি-ফ্যাক্টর বায়োমেট্রিকস ব্যবহার করুন
শুধু আঙুলের ছাপ নয়, ফেস আনলক বা ভয়েস রিকগনিশনের মতো অতিরিক্ত নিরাপত্তা যুক্ত রাখুন।
৪. পাসকি বা হাইব্রিড সিকিউরিটি ব্যবহার করুন
এতে বায়োমেট্রিক তথ্যের পাশাপাশি ডিভাইসভিত্তিক এনক্রিপ্টেড কী ব্যবহৃত হয়, যা নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করে।
ছবি পোস্ট করার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
- ক্যামেরার খুব কাছে আঙুল রেখে ‘ভিক্টরি’, ‘লাইক’ বা ‘পিস’ সাইন দিয়ে ছবি তোলা এড়িয়ে চলুন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাই-রেজল্যুশনের মূল ছবি আপলোড না করে কমপ্রেসড বা সাধারণ মানের ছবি ব্যবহার করুন।
- ব্যক্তিগত তথ্য সংবলিত ছবি প্রকাশের আগে প্রাইভেসি সেটিংস যাচাই করুন।
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সেলফি পোস্ট করার কারণে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড, টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এবং সচেতন ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই অনলাইন নিরাপত্তার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!