পাঁচ বিঘা থেকে ১৮ বিঘা, কৃষিতে বদলে গেল জীবন
পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘ ছয় বছর চাকরির চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি নওগাঁর সাইদুল হোসেন। একপর্যায়ে হতাশ হয়ে বসে না থেকে গ্রামে ফিরে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে ছোট পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত হয়েছে প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে। কমলা, মাল্টা, বরই, আম, পেয়ারা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্য বেকার তরুণদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তিনি।
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার আগ্রাদিগুন ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুল ২০১২ সালে নওগাঁ সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এরপর চাকরির আশায় ঢাকায় গেলেও প্রায় ছয় বছর ধরে স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত নিজের গ্রামে ফিরে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন।
সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের মার্চে নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে বড়ই, আম ও পেয়ারা গাছের বাগান দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে নতুন জাতের ফল ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসল যুক্ত হতে থাকে তাঁর খামারে। বর্তমানে প্রায় ১৮ বিঘা জমিজুড়ে গড়ে উঠেছে তাঁর বহুমুখী কৃষি খামার।
ছোট উদ্যোগ থেকে ১৮ বিঘার খামার
সরেজমিনে দেখা যায়, ধামইরহাট উপজেলার হযরতপুর গ্রামের কাছাকাছি এলাকায় গড়ে ওঠা খামারটিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফলের বাগান ও মৌসুমি ফসলের আবাদ।
খামারের এক বিঘা জমিতে চাষ হচ্ছে দার্জিলিং জাতের কমলা। তিন বিঘায় রয়েছে বারি-১ জাতের মাল্টা এবং আরও তিন বিঘায় চাষ হচ্ছে বারোমাসি জাতের মাল্টা। এ ছাড়া দুই বিঘা জমিতে বল সুন্দরী ও বারি জাতের বরই চাষ করছেন সাইদুল।
অবশিষ্ট জমিতে রয়েছে আম, পেয়ারা, মাষকলাই, সরিষা, বেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল। একই খামারে একাধিক ফল ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে সারা বছর চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
সাইদুল জানান, পাঁচ বিঘা নিজস্ব জমির পাশাপাশি আরও ১৩ বিঘা জমি লিজ নিয়ে খামারটির পরিসর বাড়িয়েছেন। খামার গড়ে তোলা ও পরিচালনায় এখন পর্যন্ত তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। নিজের অর্থের পাশাপাশি কৃষিঋণের টাকাও বিনিয়োগ করেছেন তিনি।
বেকারত্ব কাটিয়ে আয়ের নতুন পথ
সাইদুলের ভাষ্য অনুযায়ী, খামার থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকা লাভ করেছেন তিনি। সামনে ফলের উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লে প্রতিবছর সাত থেকে আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন এই উদ্যোক্তা।
তিনি বলেন, স্নাতকোত্তর শেষ করার পর চাকরির সন্ধানে ঢাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু ভালো চাকরি না পাওয়ায় গ্রামে ফিরে আসেন। কয়েক বছর বেকার থাকার সময় টেলিভিশনে কৃষি খামার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখে তাঁর মনে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা আসে।
এরপর নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে বড়ই, আম ও পেয়ারা দিয়ে বাগান শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সেখানে মাল্টা, কমলা, মাষকলাই, সরিষা, বেগুনসহ ১৫ থেকে ২০ ধরনের ফসলের আবাদ যুক্ত করেছেন।
সাইদুলের খামার এখন আশপাশের মানুষের কাছেও পরিচিত একটি স্থান। প্রায়ই বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাগান দেখতে আসেন। অনেকে নিজেও এমন খামার গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।
ভবিষ্যতে খামারটি আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
সাইদুলের বাগান দেখে অনুপ্রাণিত তরুণেরা
কৃষি খামারটি দেখতে আসা হযরতপুর গ্রামের বাসিন্দা মাকসুদুল হাসান বলেন, সাইদুলের গড়ে তোলা বড় বাগান দেখে তাঁর ভালো লেগেছে। নিজেও বর্তমানে বেকার থাকায় এমন একটি কৃষি খামার গড়ে তোলার কথা ভাবছেন তিনি।
আরেক দর্শনার্থী ফিরোজ ইসলাম জানান, খামারে কমলা, মাল্টা, পেয়ারা, বেগুন ও মাষকলাইসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ দেখে তিনি উৎসাহিত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে নিজেরও এমন একটি বাগান করার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
সাইদুলের উদ্যোগ তাই শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ নেই। স্থানীয় তরুণদের কাছে এটি কৃষিকাজের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির একটি সম্ভাবনাও তুলে ধরছে।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতা
স্থানীয় ধামইরহাট উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ জানান, সাইদুল ইতিমধ্যে এলাকায় একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁর খামারে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে চাষাবাদসংক্রান্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তাও দেওয়া হয়।
বিশেষ করে কমলা চাষে সাইদুলের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ধরনের বাগান গড়ে তুলতে আগ্রহী অন্য কৃষকদেরও কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
কৃষিই হতে পারে কর্মসংস্থানের পথ
চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে নিজের জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উদ্যোক্তা হয়েছেন সাইদুল হোসেন। পাঁচ বিঘা জমিতে শুরু হওয়া উদ্যোগের বিস্তার এখন প্রায় ১৮ বিঘায়। তাঁর অভিজ্ঞতা স্থানীয় তরুণদের সামনে বিকল্প কর্মসংস্থানের একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে।
তবে কৃষি খামার গড়ে তুলতে জমি, বিনিয়োগ, ফসল নির্বাচন, বাজার চাহিদা ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগাতে পারলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সাইদুলের যাত্রা দেখায়, চাকরির সন্ধানে দীর্ঘ সময় পার হলেও সম্ভাবনার পথ বন্ধ হয়ে যায় না। নিজের দক্ষতা, জমি ও আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগও রয়েছে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!