Dark Mode
Image
  • Tuesday, 29 September 2026
বিষমুক্ত করলা, তবু মিলছে না ন্যায্য দাম

বিষমুক্ত করলা, তবু মিলছে না ন্যায্য দাম

জমির চারপাশে নীল জালের বেড়া। ভেতরে বাঁশ ও জালের মাচা বেয়ে ওপরে উঠেছে করলাগাছের লতা। ঝুলছে থোকায় থোকায় সবুজ করলা। পোকামাকড় দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। মাটিতে দেওয়া হয়েছে জৈব সার। উত্তম কৃষি চর্চা বা গ্যাপ (GAP) পদ্ধতিতে এভাবেই করলা চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার দুই কৃষক। তবে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় তাদের মুখে হাসি নেই।

উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ধলনগর গ্রামের কৃষক দবির উদ্দিন ফারাজী ও আব্দুল বারী তিন বিঘা জমিতে আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। গত ১০ দিনে তারা বিক্রি করেছেন প্রায় ২ হাজার ২০০ কেজি করলা। এতে আয় হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দেড় মাসে আরও চার হাজার কেজির বেশি করলা বিক্রির আশা করছেন তারা। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা।

কিন্তু তাদের আক্ষেপ, প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজির সঙ্গে একই বাজারে একই দামে বিক্রি করতে হচ্ছে গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করা করলা। ফলে বাড়তি খরচ ও পরিশ্রমের তুলনায় লাভ হচ্ছে কম।

বেশি খরচে চাষ, মিলছে না বাড়তি দাম

কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে ধলনগর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, করলাখেতটি নীল নেট দিয়ে ঘেরা। পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করা হয়েছে ফেরোমন ফাঁদ ও জৈব বালাইনাশক। জমিতে দেওয়া হয়েছে জৈব সার। একজন কৃষক খেতের পরিচর্যা করছেন, আরেকজন তুলছেন পাকা করলা।

কৃষক দবির উদ্দিন ফারাজী জানান, গ্যাপ পদ্ধতিতে করলা চাষ করতে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় বেশি খরচ হয়। জাল, ফাঁদ, জৈব সারসহ বিভিন্ন উপকরণ কিনতে হয়। তবে এ পদ্ধতিতে ফলন ভালো হচ্ছে এবং উৎপাদিত সবজি তুলনামূলক নিরাপদ। কিন্তু বাজারে ক্রেতারা এসব সবজির জন্য বাড়তি দাম দিতে আগ্রহী নন।

তিনি বলেন, তিন বিঘা জমিতে জমি চাষ, বীজ, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরিচর্যা বাবদ প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ প্রথম ১০ দিনে ২ হাজার ২০০ কেজি করলা বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। পাইকারিতে প্রতি কেজি করলা বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৫৫ টাকা দরে।

দবির উদ্দিনের ভাষ্য, গত বছর একই সময়ে প্রতি কেজি করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এবার দাম অনেক কম। গত বছরের মতো দাম পাওয়া গেলে তাদের আয় আরও বাড়ত।

আলাদা বাজারের দাবি কৃষকদের

দবির উদ্দিন ও আব্দুল বারীর প্রত্যাশা, একদিন তাদের উৎপাদিত করলা ঢাকা ও কুষ্টিয়ার বড় বাজারগুলোতে পৌঁছাবে। পণ্যের গায়ে থাকবে পরিচিতিমূলক লেবেল, আর ক্রেতারা জেনেশুনে কিনতে পারবেন গ্যাপ পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি। এতে ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন তারা।

কৃষক আব্দুল বারী বলেন, বিষমুক্ত ও প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি একই বাজারে বিক্রি হওয়ায় আলাদা করে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের দাবি, বাজারে বিষমুক্ত সবজির জন্য আলাদা কর্নার চালু করা হোক। তাহলে ক্রেতারা পণ্যের ধরন বুঝে কিনতে পারবেন, আর কৃষকেরাও উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পাবেন।

করলা চাষে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন অন্য কৃষকেরাও

ধলনগর গ্রামের আরেক কৃষক উজ্জল চৌধুরী প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ফসলের চাষ করেন। তিনি জানান, গত বছর আট কাঠা জমিতে করলা চাষ করে প্রায় ১২ হাজার টাকা খরচে ৬০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতায় চলতি বছর জমির পরিমাণ বাড়িয়ে ১০ কাঠায় করলা চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে বিক্রি করেছেন ৯০ কেজি করলা। ন্যায্য দাম পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে করলা চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

একই গ্রামের মোহন শেখ গত বছর এক বিঘা জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। চলতি বছর একই পরিমাণ জমিতে আগাম করলা চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। বিপরীতে করলা বিক্রি করেছেন প্রায় দেড় লাখ টাকার। এতে ভালো লাভ হয়েছে বলে জানান তিনি। আগামী বছর কৃষি প্রণোদনা পেলে মালচিংয়ের পাশাপাশি বিষমুক্ত করলা চাষেও আগ্রহী তিনি।

অন্যদিকে, যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মাজেদ ২০ শতাংশ জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে নাবিলা ও আলিসা জাতের করলা চাষ করেছেন। তার ভাষ্য, চারা রোপণের প্রায় ৪০ দিন পর থেকেই ফলন পাওয়া যাচ্ছে। প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচে প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ মণ করলা উৎপাদন হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় দাম কম থাকায় লাভের পরিমাণ সীমিত হয়ে পড়েছে।

বাজারে কমছে করলার দাম

পান্টি হাটবাজারের আড়তদার মিলন হোসেন জানান, বাজারে বিষমুক্ত সবজি বিক্রির জন্য আলাদা কোনো কর্নার নেই। প্রায় ২০ দিন আগে প্রতি কেজি করলা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে পাইকারি দাম নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।

কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অথচ বাজারে করলার দাম কমেছে। এতে লোকসান না হলেও পরিশ্রম ও বিনিয়োগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

কুমারখালীতে ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কুমারখালী উপজেলায় প্রায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তিন বিঘা জমিতে গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে। বাকি জমির কিছু অংশে ব্যবহার করা হচ্ছে মালচিংসহ আধুনিক চাষপদ্ধতি। এ মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন করলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বাজারদর অনুযায়ী, উৎপাদিত করলার সম্ভাব্য মূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি।

উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. বিল্টু হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে কৃষকেরা তিন বিঘা জমিতে উত্তম কৃষি চর্চা পদ্ধতিতে এবং অন্য জমিতে মালচিং পদ্ধতিতে করলা চাষ করেছেন। কম সময়ে ভালো ফলন ও লাভের সম্ভাবনা থাকায় শুধু ধলনগর গ্রামেই প্রায় ২১ বিঘা জমিতে করলার আবাদ হয়েছে। বাজারে বিষমুক্ত সবজির আলাদা কর্নার চালু করা গেলে এ ধরনের চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় ৫২ হেক্টর জমিতে করলা চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৫০০ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য দেড় কোটি টাকার বেশি। গ্যাপ পদ্ধতিতে সবজি চাষের বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, এ পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজির বাজারজাতকরণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে বিষমুক্ত সবজির আলাদা হাট চালুর প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদিত সবজির পরিচিতি নিশ্চিত করা এবং বাজারে আলাদা বিক্রির ব্যবস্থা করা গেলে গ্যাপ পদ্ধতিতে চাষ আরও ছড়িয়ে পড়বে। এতে একদিকে যেমন কৃষকেরা ন্যায্য দাম পাবেন, অন্যদিকে ক্রেতারাও বেছে নিতে পারবেন নিজেদের পছন্দের সবজি।

Comment / Reply From