৯৫-এও মাঠে, পেঁপেতে আয়
বয়স ৯৫ বছর। এই বয়সে অনেকেই বিশ্রামে সময় কাটান। কিন্তু বরগুনার রুস্তম আলীর দিন শুরু হয় মাঠে। শরীরের বয়সের ছাপ থাকলেও কর্মোদ্যমে কোনো ভাটা পড়েনি। চুক্তিতে নেওয়া প্রায় দেড় একর জমিতে দেশি শাহী জাতের পেঁপে চাষ করে নিজের আয় যেমন করছেন, তেমনি স্থানীয়দেরও উৎসাহিত করছেন কৃষিকাজে।
বরগুনা সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আমতলী-নিমতলী এলাকায় গড়ে উঠেছে রুস্তম আলীর পেঁপের বাগান। সেখানে তিনি প্রায় ৩৫০টি দেশি শাহী জাতের পেঁপের চারা রোপণ করেছেন। নিয়মিত পরিচর্যায় গাছগুলো এখন ফল দিতে শুরু করেছে। প্রতি সপ্তাহে পেঁপে বিক্রি করে তাঁর নিট আয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
সকাল হলেই বাগানে রুস্তম
বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়েছে, তবুও প্রতিদিন সকালে বাগানে চলে আসেন রুস্তম আলী। কোনো গাছ হেলে পড়লে সেটি ঠিক করে দেন, গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করেন। আবার প্রয়োজন অনুযায়ী পেঁপের পরিপক্বতা দেখে বাজারজাত করার প্রস্তুতিও নেন।
তাঁর এই ব্যতিক্রমী কর্মচাঞ্চল্য দেখতে স্থানীয় বাসিন্দারাও প্রায়ই বাগানে আসেন। মোমেনা, আমিনুদ্দিন ও রুবেলসহ স্থানীয় কয়েকজন বলেন, এই বয়সেও রুস্তম চাচাকে মাঠে কাজ করতে দেখে তাঁরা অবাক হন। তাঁর পরিশ্রম ও আগ্রহ দেখে অনেকে নিজের বাড়িতেও অল্প পরিসরে চাষাবাদ শুরু করেছেন।
প্রতি সপ্তাহে বাজারে নেন নিজের ফলন
পেঁপে বাগানের দেখভালের পাশাপাশি উৎপাদিত পেঁপে নিজেই বরগুনা বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন রুস্তম আলী। তাঁর হিসাবে, প্রতি সপ্তাহে পেঁপে বিক্রি করে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিট লাভ থাকে।
চলতি মৌসুমে বাগান থেকে অন্তত ২ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির লক্ষ্য রয়েছে তাঁর।
নিজের চাষাবাদের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রুস্তম আলী বলেন, কাজের মধ্যে থাকলে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। বসে না থেকে জমিতে পরিশ্রম করেন বলেই নিজের আয় হচ্ছে, পাশাপাশি ভালোও লাগছে। গত কয়েক বছর ধরে তিনি পেঁপে চাষ করছেন বলেও জানান।
তরুণদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, বেকার বসে না থেকে চাষাবাদে মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিজেরাই কাজ করে আয় করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বাবার পরিশ্রমে বাড়তি আয়
রুস্তম আলীর ছেলে হাবুল হাওলাদার জানান, ৯৫ বছর বয়সেও তাঁর বাবা প্রতিদিন সকালে মাঠে যান। চুক্তিতে নেওয়া প্রায় দেড় একর জমিতে নিজের প্রচেষ্টায় পেঁপের গাছ করেছেন তিনি।
হাবুল বলেন, বাবা শুধু বাগানের পরিচর্যাই করেন না, প্রতি সপ্তাহে নিজেই পেঁপে পেড়ে বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। এই বাগান এখন তাঁদের পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠেছে।
জেলায় পেঁপে চাষ ২১৪ হেক্টরে
বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সবজি ও ফল চাষ এখনো তুলনামূলকভাবে কম। চলতি অর্থবছরে জেলায় ২১৪ হেক্টর জমিতে পেঁপের আবাদ হয়েছে। এ বছর মোট ৫ হাজার ১০০ মেট্রিক টন পেঁপে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরগুনার অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ সিএম রেজাউল করিম বলেন, ৯৫ বছর বয়সী রুস্তম আলীর পেঁপে চাষের বিষয়টি কৃষি বিভাগের নজরে এসেছে। তাঁকে প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বয়স নয়, আগ্রহই বড়
রুস্তম আলীর পেঁপে বাগান শুধু তাঁর নিজের আয়ের পথ তৈরি করেনি, স্থানীয়দের মধ্যেও কৃষিকাজের প্রতি নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি আগ্রহ থাকলে কীভাবে নিজের জন্য আয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়, তাঁর চাষাবাদ যেন তারই উদাহরণ।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রুস্তম আলীর মতো কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কৃষি পরামর্শ ও সরকারি সহযোগিতা দেওয়া গেলে অনাবাদি জমিকে চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি তরুণদেরও কৃষিকাজে উৎসাহিত করা সম্ভব।
৯৫ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও রুস্তম আলী যেন দেখিয়ে দিচ্ছেন—কাজের ইচ্ছা থাকলে বয়স কখনোই একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!