Dark Mode
Image
  • Friday, 02 October 2026
প্লাস্টিকের ভিড়ে হারাচ্ছে শীতল পাটি

প্লাস্টিকের ভিড়ে হারাচ্ছে শীতল পাটি

বিলুপ্তির পথে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি

একসময় গরমের দিনে ঘরের মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে মিলত স্বস্তি। অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে বিয়ে, গায়েহলুদ, সুন্নতে খাতনা কিংবা নানা সামাজিক আয়োজনে শীতল পাটি ছিল বাঙালির ঘরোয়া সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময় বদলেছে। প্লাস্টিক ও কৃত্রিম উপকরণের তৈরি ম্যাট সহজলভ্য হওয়ায় সেই চাহিদা এখন অনেকটাই কমে গেছে।

ফলে শত বছরের পুরোনো এই লোকশিল্প সিরাজগঞ্জে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখা কারিগররা টিকে থাকার চেষ্টা করলেও ন্যায্য দাম, কাঁচামালের বাড়তি খরচ ও বাজার সংকটে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

মুর্তা গাছের ছালে তৈরি হয় শীতল পাটি

শীতল পাটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন কুটিরশিল্প। ‘মুর্তা’ বা ‘পাটিবেত’ নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় এই পাটি। এর বুনন যত সূক্ষ্ম হয়, পাটির মান ও দামও তত বাড়ে।

ব্রিটিশ আমল থেকেই সিরাজগঞ্জের শীতল পাটির আলাদা পরিচিতি ছিল। জেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় অসংখ্য পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বর্তমানে আনুমানিক দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের জীবিকা এখনও কোনো না কোনোভাবে পাটিশিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

এর মধ্যেও কামারখন্দের চাঁদপুর, সদর উপজেলার চুনিয়াহাটি এবং রায়গঞ্জের আটঘরিয়া ও দরবস্ত গ্রামের শতাধিক পরিবার এখনও পূর্বপুরুষের এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছে।

শ্রম বেশি, আয় কম

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি শীতল পাটি তৈরি করতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। কিন্তু সেই তুলনায় পাওয়া যায় সামান্য পারিশ্রমিক।

চাঁদপুর গ্রামের কারিগর মননজয় চন্দ্র বলেন, একটি পাটি বুনতে অনেক সময় ও শ্রম দিতে হয়। কিন্তু বিক্রির সময় সেই শ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়া যায় না। এ কারণে অনেক কারিগর বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

একই গ্রামের মমতা রাণী ও স্বপ্না রাণীর ভাষ্য, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে প্লাস্টিকের ম্যাটের আধিপত্যও শীতল পাটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তাহে একটি পাটি বুনে তারা প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পান। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় নতুন প্রজন্মও এ পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে।

কমেছে পাটির কদর

৯০ বছর বয়সী কারিগর দুলাল চন্দ্র ভৌমিকের স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বল শীতল পাটির সেই সুদিন। তার ভাষ্য, ৫ ফুট বাই ৭ ফুট আকারের একটি ভালো মানের শীতল পাটি দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। একই মাপের বুটকা দিয়ে তৈরি সাধারণ পাটির দাম প্রায় ৬০০ টাকা।

তিনি জানান, একসময় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে পাটি কিনে নিয়ে যেতেন। তখন শীতল পাটির চাহিদাও ছিল বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়া, ফ্যান ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধার ব্যবহার এবং বাজারে নানা ধরনের বিকল্প পণ্যের বিস্তারে শীতল পাটির ব্যবহার কমে গেছে।

কারিগরদের একটি অংশ বলছেন, শুধু বাজার সংকট নয়, পুঁজি না থাকা এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াও এই শিল্পের বড় বাধা। ফলে ঐতিহ্য ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও অনেক পরিবার আর এই পেশায় টিকে থাকতে পারছে না।

সরকারি সহায়তার আশ্বাস

সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলার প্রাচীন এই ঐতিহ্য ও এর সঙ্গে জড়িত কারিগরদের রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, কারিগরদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণন সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারিগরদের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শীতল পাটির বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আধুনিক পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং দেশ-বিদেশে বাজার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শীতল পাটি শুধু একটি ব্যবহার্য সামগ্রী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামীণ জীবন, লোকঐতিহ্য ও বহু প্রজন্মের কারিগরদের শ্রম। তাই সময়ের স্রোতে এই শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু একটি পেশাই নয়, হারিয়ে যাবে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও।

Comment / Reply From