হেবরনে নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজায়
পাথরে বাঁধানো সরু গলি। দুই পাশে সারি সারি দোকান। কোথাও খেজুর, কোথাও রুপার গহনা, আবার কোথাও রঙিন পাথরে তৈরি তসবিহ ও আতর বিক্রি হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা। লাল, সবুজ, সাদা ও কালো রঙের পতাকাগুলো দোকানের সামনে ঝুলছে। মনে হয়, এই শহরের প্রতিটি গলি যেন নিজের ইতিহাস, সংগ্রাম আর আত্মমর্যাদার কথা নীরবে বলে যাচ্ছে।
পথচারীদের মুখে সৌজন্যের হাসি থাকলেও চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। এখানে প্রতিদিনের জীবন যেন নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলে। তবু মানুষের বিশ্বাস, আশা আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা নিভে যায়নি।
আমরা দ্রুত পায়ে হেবরনের পুরোনো শহরের দিকে এগিয়ে চলেছি। চারপাশে প্রাচীন পাথরের দেয়াল, মাথার ওপর কোথাও কোথাও টানানো জাল। বাতাসে পুরোনো ধুলো, মসলা আর ইতিহাসের এক অদ্ভুত মিশ্র গন্ধ। মনে হচ্ছিল, প্রতিটি গলি যেন শত শত বছরের কোনো গল্প বুকে ধারণ করে আছে।
পুরোনো শহরের পথে এক অন্য বাস্তবতা
হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করলাম, কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে আমাদের পিছু নিয়েছে। ধুলোমাখা মুখ, চোখে কৌতূহল আর অসহায় আবেদন। কেউ হাত বাড়িয়ে বলছে, ‘মাসারি, মাসারি’—অর্থাৎ টাকা চাইছে।
আমাদের এক সহযাত্রী মমতা করে একটি শিশুর হাতে কয়েকটি কয়েন তুলে দিলেন। মুহূর্তেই চারপাশ থেকে আরও অনেক শিশু এগিয়ে এল। কেউ জামা টানছে, কেউ পায়ের কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে, কেউ আবার নীরবে তাকিয়ে আছে।
তাদের মধ্যে কেউ পানি এগিয়ে দিচ্ছে, কেউ পথ দেখানোর চেষ্টা করছে, আবার কেউ ছোটখাটো কিছু বিক্রি করতে চাইছে। সবকিছুর মধ্যেই যেন জীবিকার তাগিদ। সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল তাদের চোখেমুখের পরিণত ভাব। যে বয়সে শিশুদের খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে থাকার কথা, সেই বয়সেই তাদের জীবনে নেমে এসেছে কঠিন বাস্তবতা।
একজন স্থানীয় ব্যক্তি নিচু স্বরে জানালেন, এই শিশুদের অনেকের বাবা নিহত হয়েছেন, আবার কেউ কেউ ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি। কথাটি শুনে বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। মনে হলো, এই শহরে অনেক শিশুর শৈশব যেন বাস্তবতার নির্মম চাপে খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়।
আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে। গলির দেয়ালে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। মসজিদের দিকে মানুষের চলাচল বাড়ছে। কেউ ওজুর জন্য ছুটছেন, কেউ দোকান বন্ধ করছেন। গলির শেষ প্রান্তে চোখে পড়ল ইব্রাহিমি মসজিদের প্রবেশপথ। এখানেই অবস্থিত নবী ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সমাধি বলে বিশ্বাস করা হয়। পবিত্র এই স্থান জিয়ারত করতে দূরদূরান্ত থেকে আসেন অসংখ্য মানুষ।
কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রবেশ
ইব্রাহিমি মসজিদের প্রবেশপথে পৌঁছে মনে হলো, যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে এসে পড়েছি। লোহার গেট, উঁচু প্রাচীর, সিসিটিভি ক্যামেরা আর অস্ত্রধারী ইসরায়েলি সেনাদের কঠোর পাহারা। চারপাশে নিরাপত্তার কড়াকড়ি, পরিবেশও বেশ থমথমে।
আমাদের গাইড হাসান আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আমাদের পাসপোর্টের কপি। তিনি নিচু স্বরে বললেন, ‘ভয় পাবেন না, ধীরে ধীরে এগিয়ে আসুন। পাসপোর্ট দেখাবেন। কথা বলবেন না, হাসবেন না, ছবি তুলবেন না।’
আমরা একে একে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। মনের মধ্যে অজানা এক ভয় কাজ করছিল। যদি প্রবেশের অনুমতি না মেলে? যদি কোনো কারণে ফিরিয়ে দেওয়া হয়? আমরা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী হওয়ায় হয়তো প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হতে পারে—এমন আশাও মনে উঁকি দিচ্ছিল।
ধাতব দরজা পেরিয়ে চেকপোস্টের ভেতরে ঢোকার সময় মনে হলো, যেন এক অদৃশ্য সীমারেখা অতিক্রম করছি। একদিকে হাজার বছরের ইতিহাস ও ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যদিকে বর্তমানের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা।
সরু রাস্তা আর মানুষের ভিড় পেরিয়ে আমরা অবশেষে নিরাপত্তাবেষ্টিত মূল ফটকের সামনে পৌঁছালাম। স্ক্যানার, অস্ত্রধারী সেনা আর কড়া পাহারার মধ্যে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের গাইড ভেতরে প্রবেশের অনুমতি আনতে গেলেন।
অপেক্ষার সময় আমাদের চালক এই পবিত্র স্থানের ইতিহাস সংক্ষেপে জানালেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় চার হাজার বছর আগে এখানে একটি প্রাকৃতিক গুহা ছিল। হজরত সারাহ (আ.)-এর ইন্তেকালের পর নবী ইব্রাহিম (আ.) সমাধিস্থ করার উদ্দেশ্যে গুহাটি স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে কিনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এখানে নবী ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সমাধি স্থাপিত হয় বলে ধর্মীয় ঐতিহ্যে বর্ণিত রয়েছে।
প্রায় দুই হাজার বছর আগে রোমান শাসক হেরোড দ্য গ্রেট এই গুহাকে ঘিরে বিশাল প্রাচীর ও স্থাপনা নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্থানটি মসজিদে রূপান্তরিত হয়। বিভিন্ন সময়ে সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এটি আজকের ইব্রাহিমি মসজিদের রূপ পেয়েছে।
নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজার সামনে
কিছুক্ষণ পর গাইড ফিরে এসে জানালেন, আমাদের প্রবেশের অনুমতি মিলেছে। এতক্ষণ যে ভয় আর উৎকণ্ঠা কাজ করছিল, অনুমতি পাওয়ার পর তা অনেকটাই কেটে গেল।
ভেতরে ঢুকতেই এক গভীর, প্রশান্ত পরিবেশ আমাদের ঘিরে ধরল। বিশাল পাথরের দেয়াল, সুউচ্চ স্তম্ভ, মৃদু আলো আর নীরবতা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, সময় যেন এখানে ধীর হয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লি ও জিয়ারতকারীদের কেউ নামাজ পড়ছেন, কেউ দোয়ায় মগ্ন, আবার কারও চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু।
আমাদের জিয়ারত শুরু হলো নবী ইসহাক (আ.)-এর সমাধির কাছ থেকে। এরপর একে একে দেখলাম হজরত সারাহ (আ.), নবী ইসহাক (আ.) ও তাঁর স্ত্রী হজরত রিবকা (আ.), নবী ইয়াকুব (আ.) ও তাঁর স্ত্রী হজরত লেয়া (আ.)-এর সমাধি হিসেবে পরিচিত স্থানগুলো।
সবশেষে আমরা প্রবেশ করলাম নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজা শরিফের কক্ষে। প্রশস্ত কক্ষটির মাঝখানে রয়েছে একটি শক্ত প্রাচীর। কক্ষের এক পাশ মুসলমানদের এবং অন্য পাশ ইহুদিদের প্রার্থনার জন্য নির্ধারিত।
একই ছাদের নিচে দুই ধর্মের মানুষের উপাসনার স্থান, অথচ মাঝখানে বিভাজন। দৃশ্যটি আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল। ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস আর বর্তমান বাস্তবতা যেন একই জায়গায় এসে মিলেছে।
নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। চোখের কোণে কখন যে পানি জমেছে, বুঝতেই পারিনি। মনে হচ্ছিল, এমন এক মহান নবীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে দাঁড়িয়ে আছি, যাঁর ঈমান, ধৈর্য ও ত্যাগ মুসলিমদের কাছে চিরকাল অনুকরণীয়। তিনি ‘খলিলুল্লাহ’—আল্লাহর বন্ধু—নামে পরিচিত।
আমি নীরবে দরুদ পাঠ করলাম। মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানালাম, এমন একটি পবিত্র স্থান জিয়ারতের সুযোগ দেওয়ার জন্য। মসজিদে নামাজ আদায় করে দোয়া করলাম নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য। দোয়া করলাম ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য, পৃথিবীর সব মানুষের শান্তি ও কল্যাণের জন্য।
প্রায় তিন ঘণ্টা কাটালাম এই পবিত্র প্রাঙ্গণে। নামাজ, দোয়া, জিয়ারত আর নীরব ভাবনায় কীভাবে যে সময় পেরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছিল, আরও কিছুক্ষণ এখানে থেকে যাই। কিন্তু ফেরার সময় হলো। ভারী হৃদয়ে বেরিয়ে এলাম। পেছনে পড়ে রইল ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়, আর সঙ্গে নিয়ে ফিরলাম এমন এক স্মৃতি, যা আমার হৃদয়ে চিরকাল জাগরুক থাকবে।
তিন মাস পর আবার হেবরনে
প্রথম সফরের ঠিক তিন মাস পর আবারও হেবরনে যাওয়ার সৌভাগ্য হলো। এবার একটি দল নিয়ে এসেছি। আধুনিক হেবরন শহরে গাড়ি থেকে নেমে পুরোনো শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। এবার চোখে পড়ল শহরের আরেকটি রূপ—ব্যস্ত সড়ক, দোকানপাট, বাজার আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রাণচাঞ্চল্য।
সেদিন আমরা ইব্রাহিমি মসজিদে প্রবেশ করেছিলাম অন্য একটি গেট দিয়ে। পুরোনো শহরের সেই পরিচিত সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আবার দেখা হয়ে গেল সেই শিশুদের সঙ্গে। আমাকে দেখে তারা হাসিমুখে বলে উঠল, ‘Welcome, friend!’
তাদের ছোট্ট এই সম্ভাষণ আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। মনে হলো, হেবরনের সঙ্গে আমার যেন এক অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। প্রথম সফরের স্মৃতি মুহূর্তেই ফিরে এল। সেই গলি, সেই শিশুরা, তাদের চোখের কৌতূহল আর জীবনের কঠিন বাস্তবতা—সবকিছু যেন আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সেদিনও আমরা মসজিদ ও রওজার ভেতরে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়েছিলাম। সেখানে যে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নীরব প্রার্থনা, দোয়ার মুহূর্ত আর পবিত্র পরিবেশের অনুভূতি মনের গভীরে স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছে।
ফিলিস্তিনি পরিবারের আতিথেয়তায় মুগ্ধতা
সফরের আরেকটি স্মরণীয় অংশ ছিল স্থানীয় এক ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়া। তাদের বাড়ি ছিল সাধারণ, খাবারও ছিল সাদামাটা। কিন্তু আতিথেয়তায় ছিল আন্তরিকতা আর ভালোবাসার পূর্ণতা।
তারা যেভাবে আমাদের আপ্যায়ন করেছেন, তাতে মনে হয়নি আমরা অপরিচিত কেউ। বরং মনে হচ্ছিল, নিজের কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বসে আছি। তাদের সম্মান, মমতা ও আন্তরিক ব্যবহার আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।
সেই দুপুরের খাবার শুধু একটি আহারের স্মৃতি হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতার এক উজ্জ্বল অভিজ্ঞতা। অচেনা শহরে অপরিচিত মানুষের এমন আপন করে নেওয়া সত্যিই ভোলার নয়।
স্মৃতিতে অমলিন নবীদের শহর
হেবরন সফরের স্মৃতিগুলো আজও আমার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। ইব্রাহিমি মসজিদের নীরবতা, নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর রওজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুভব করা আবেগ, পুরোনো শহরের সরু গলি, শিশুদের ‘Welcome, friend’ বলা আর ফিলিস্তিনি পরিবারের অকৃত্রিম আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে এই সফর আমার জীবনের এক অমূল্য অধ্যায়।
নবীদের শহর আল-খলিল যেন এখনো আমাকে দূর থেকে ডাক দেয়। জীবনে আবার সেখানে যাওয়া হবে কি না, জানি না। তবে প্রথম সফরের সেই অনুভূতি, ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর বিস্ময় আর মানুষের ভালোবাসার স্মৃতি আমার হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে থাকবে।
হেবরন আমার কাছে শুধু একটি ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় স্থান নয়; এটি বিশ্বাস, স্মৃতি, মানবিকতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও বেঁচে থাকার এক গভীর অভিজ্ঞতার নাম।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!