Dark Mode
Image
  • Wednesday, 10 June 2026
বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারি: অজানা কিন্তু উচ্চ সম্ভাবনার ক্যারিয়ার

বাংলাদেশে অ্যাকচুয়ারি: অজানা কিন্তু উচ্চ সম্ভাবনার ক্যারিয়ার

বাংলাদেশে সন্তানের ভবিষ্যৎ বলতে এখনও অনেক পরিবারের চোখে ভাসে চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা করপোরেট পেশাজীবীর ছবি। ভালো ফলাফল মানেই মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং—এমন ধারণা বহুদিনের। কিন্তু বদলে যাওয়া বিশ্বে ক্যারিয়ারের এই একমুখী চিন্তা আর যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি, ডেটা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিলতা তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। সেই সম্ভাবনাময় কিন্তু এখনও অচেনা একটি পেশা হলো অ্যাকচুয়ারি।

অ্যাকচুয়ারি মূলত এমন এক পেশা, যেখানে ভবিষ্যতের ঝুঁকি অনুমান নয়, বরং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। গণিত, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি এবং ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে একজন অ্যাকচুয়ারি হিসাব করেন—কতজন মানুষ অসুস্থ হতে পারেন, বিমা দাবি কত বাড়তে পারে বা একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় কত হতে পারে। অর্থাৎ অনিশ্চয়তার মধ্যেও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারা।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটাই ‘রিস্ক বেজড’। ব্যাংক, বিমা, পেনশন ফান্ড, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান—সবখানেই ঝুঁকি বিশ্লেষণ অপরিহার্য। ফলে অ্যাকচুয়ারিরা শুধু সংখ্যার হিসাব রাখেন না, বরং প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। উন্নত দেশগুলোতে এই পেশা ইতোমধ্যেই উচ্চ আয়ের এবং সম্মানজনক ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরে অ্যাকচুয়ারিরা কাজ করছেন বিমা, ব্যাংকিং, করপোরেট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন অ্যাকচুয়ারিরা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সাইবার সিকিউরিটি, স্বাস্থ্য অর্থনীতি এবং ডেটা-চালিত পূর্বাভাস তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ফলে এটি আর কেবল বিমা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং একটি আধুনিক ‘ডেটা ড্রিভেন রিস্ক সায়েন্স’-এ পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই পেশার গুরুত্ব আরও বেশি। দেশে বর্তমানে ৮০টির বেশি বিমা প্রতিষ্ঠান থাকলেও দক্ষ অ্যাকচুয়ারির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে প্রিমিয়াম নির্ধারণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ, পলিসি মূল্যায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো অনেক ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির বদলে অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে পুরো আর্থিক খাতেই তৈরি হয় কাঠামোগত দুর্বলতা।

বিশ্বব্যাপী যেখানে ‘রিস্ক বেজড ক্যাপিটাল’ বা IFRS-17-এর মতো জটিল আর্থিক কাঠামো অনুসরণ করা হচ্ছে, সেখানে অ্যাকচুয়ারির অভাব বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ দেশে এই পেশায় দক্ষ জনবলের সংখ্যা হাতে গোনা। ফলে মেধাবীরা বিদেশমুখী হচ্ছেন, আর দেশ হারাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

অ্যাকচুয়ারি হতে হলে পথটি সহজ নয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হতে হলে বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষা ধাপে ধাপে পাস করতে হয়। যুক্তরাজ্যের Institute and Faculty of Actuaries, যুক্তরাষ্ট্রের Society of Actuaries বা Casualty Actuarial Society—এমন সংস্থাগুলো এই স্বীকৃতি প্রদান করে। এই পরীক্ষাগুলোতে সম্ভাব্যতা, আর্থিক গণিত, অর্থনীতি, ঝুঁকি মডেলিং ও ডেটা অ্যানালিটিকসের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে।

যদিও এই পথ কঠিন, কিন্তু সফল হলে এর পুরস্কারও বিশাল। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, উচ্চ আয়, পেশাগত নিরাপত্তা—সবই মেলে এই পেশায়। একজন দক্ষ অ্যাকচুয়ারি বিশ্বের যেকোনো দেশে কাজ করার সুযোগ পান।

বাংলাদেশেও এ পেশা উন্নয়নে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স চালু, বৃত্তি প্রদান, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সচেতনতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। অনেক শিক্ষার্থীই এই পেশা সম্পর্কে জানেন না, ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তারা অন্য পথে চলে যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও আগ্রহ অনুযায়ী ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। যারা গণিত, বিশ্লেষণী চিন্তা ও ডেটা নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য অ্যাকচুয়ারি হতে পারে আদর্শ পেশা।

বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে দক্ষ ঝুঁকি বিশ্লেষক তৈরি করা জরুরি। তাই সময় এসেছে প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনাকে গ্রহণ করার। অ্যাকচুয়ারি পেশা হতে পারে সেই অজানা পথ, যেখানে মেধা পায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ পায় দৃঢ় ভিত্তি।

Comment / Reply From