লিটারের পর লিটার পানি পান! অজানা এই রোগে বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকি
সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত পানি পান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি পানও শরীরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা রয়েছে, যেখানে কোনো শারীরিক প্রয়োজন না থাকলেও একজন ব্যক্তি বারবার পানি পান করার তীব্র তাড়না অনুভব করেন। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া’।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু অতিরিক্ত তৃষ্ণা নয়; বরং এক ধরনের বাধ্যতামূলক আচরণ, যা দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া কী?
সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়া মূলত একটি মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা। এ অবস্থায় শরীরে পানির ঘাটতি না থাকলেও মস্তিষ্ক বারবার পানি পানের সংকেত পাঠাতে থাকে। ফলে ব্যক্তি অস্বাভাবিক মাত্রায় পানি পান করতে থাকেন।
এই সমস্যা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা তীব্র উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিরা এ ধরনের আচরণের ঝুঁকিতে থাকেন।
কেন বিপজ্জনক?
অতিরিক্ত পানি পান করার ফলে শরীরে ‘ওয়াটার ইনটক্সিকেশন’ বা পানি বিষক্রিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোনাট্রেমিয়া’ নামে পরিচিত।
রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা কমে গেলে শরীরের কোষগুলো অতিরিক্ত পানি শোষণ করতে শুরু করে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের কোষ ফুলে গিয়ে সেরেব্রাল ইডেমা তৈরি করতে পারে। এতে মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ বৃদ্ধি পায়, যা গুরুতর অবস্থায় জীবনহানির কারণও হতে পারে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়ার কারণে শরীরের সোডিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
- তীব্র মাথাব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতা
- মানসিক বিভ্রান্তি
- মাংসপেশিতে দুর্বলতা বা খিঁচুনি
- অস্বাভাবিক ঘন ঘন প্রস্রাব
- গুরুতর অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি প্রাণঘাতী পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৫ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণেও অতিরিক্ত তৃষ্ণা অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত পানি পান করার প্রবণতাও এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
সাইকোজেনিক পলিডিপসিয়ার চিকিৎসায় শুধু পানি পানের পরিমাণ কমানোই যথেষ্ট নয়। এর মূল মানসিক কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তরল গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ
চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করতে হবে।
নিয়মিত পরীক্ষা
রক্তে সোডিয়াম ও অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
আচরণগত থেরাপি
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত পানি পানের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
সচেতন থাকুন
পানি জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য হলেও অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়। পিপাসা না থাকা সত্ত্বেও বারবার পানি পান করার প্রবণতা থাকলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই পারে এই নীরব কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যার হাত থেকে সুরক্ষা দিতে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!