এক টাকায় ৫২ বছরের শিক্ষাসেবা
শিক্ষাদানের বিনিময়ে নেন মাত্র এক টাকা। এভাবেই টানা ৫২ বছর ধরে গাইবান্ধার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন লুৎফুর রহমান। বয়স এখন ৮০ বছর। তবু থেমে নেই তাঁর পথচলা। পুরোনো সাইকেলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে শিশুদের পড়ান তিনি। তাঁর কাছে শিক্ষার্থীদের সাফল্যই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
লুৎফুর রহমানের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে নিজের জীবনের কঠিন এক অভিজ্ঞতা। ১৯৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র নদের ভয়াবহ ভাঙনে তাঁদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। নিজের শিক্ষাজীবনে এমন বাধার মুখোমুখি হয়েই তিনি উপলব্ধি করেন, দারিদ্র্য যেন অন্য কোনো শিশুর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
সেই উপলব্ধি থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপর একে একে পেরিয়ে গেছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়। বয়স বাড়লেও শিক্ষার্থীদের পড়ানোর প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি।
নিজের কষ্ট থেকেই শিক্ষাসেবার শুরু
দারিদ্র্যের কারণে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে না পারার কষ্ট লুৎফুর রহমানকে অন্য শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি চেয়েছেন, অর্থের অভাবে কোনো শিশুকে যেন বই-খাতা থেকে দূরে সরে যেতে না হয়।
তাই সামান্য এক টাকার বিনিময়ে শিশুদের পড়িয়ে আসছেন তিনি। এই নামমাত্র অর্থ তাঁর শিক্ষাদানের মূল্য নির্ধারণের চেয়ে বরং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের একটি প্রতীক হিসেবেই বেশি অর্থবহ। তাঁর মূল লক্ষ্য, দরিদ্র পরিবারের শিশুরাও যেন পড়াশোনার সুযোগ পায় এবং ভবিষ্যতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
পুরোনো সাইকেলে গ্রামে গ্রামে
৮০ বছর বয়সেও লুৎফুর রহমান নিয়মিত শিশুদের পড়ানোর কাজে যুক্ত। পুরোনো সাইকেলে গ্রামে গ্রামে ঘুরে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে যান। দীর্ঘদিনের এই পথচলায় বয়স কিংবা শারীরিক ক্লান্তি তাঁর শিক্ষাসেবার আগ্রহকে থামাতে পারেনি।
তাঁর কাছে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থী আজ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক ও পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একসময় যেসব শিশু সীমিত সুযোগ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিল, তাদের এমন সাফল্যই লুৎফুর রহমানের সবচেয়ে বড় আনন্দ ও গর্ব।
শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান নিজের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সার্থকতা।
দীর্ঘ শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি
বছরের পর বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদানে অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন লুৎফুর রহমান। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অবসর ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দেন। দীর্ঘদিনের শিক্ষাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ এই ঘোষণা তাঁর জীবনে নতুন এক প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এক টাকার বিনিময়ে অমূল্য অবদান
লুৎফুর রহমানের গল্প কেবল একজন শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের গল্প নয়। এটি নিজের জীবনের প্রতিকূল অভিজ্ঞতাকে অন্যের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগে রূপ দেওয়ারও গল্প।
যে অর্থাভাবে একসময় তাঁর নিজের পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অন্য শিশুদের শিক্ষার পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য, সম্মাননা আর মানুষের ভালোবাসা—সব মিলিয়ে লুৎফুর রহমানের প্রাপ্তির হিসাব এক টাকায় মাপা সম্ভব নয়। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাসেবা মনে করিয়ে দেয়, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়; শিক্ষার্থীদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়াও।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!