লন্ডন ছেড়ে গ্রামে, মানুষের সেবায় ওসমান গণি
লন্ডনে দীর্ঘদিন চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। সেখানে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে থেকে যাওয়ার সুযোগও ছিল। কিন্তু জন্মভূমির প্রতি টান তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে নিজের গ্রামে। ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের জীবন ছেড়ে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার মনইল-কানুপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন মোহাম্মেদ ওসমান গণি সরদার। বয়স এখন ৯১ বছর। এই বয়সেও গ্রামের মানুষের কল্যাণে নানা উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
গ্রামের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ও ঘরের দেয়ালে সাজানো বিভিন্ন বাণী। বাড়ির নির্মাণশৈলী ও সাজসজ্জায় লন্ডনে কাটানো দীর্ঘ জীবনের ছাপ রয়েছে। এত বড় বাড়িতে বর্তমানে একাই থাকেন ওসমান গণি। তাঁর দেখভালের জন্য রয়েছেন দুজন গৃহকর্মী। স্ত্রী ও সন্তানেরা এখনো লন্ডনে থাকলেও তিনি নিজের জীবনের বাকি সময়টুকু কাটাতে চান জন্মভূমির মানুষের সঙ্গে।
শুধু গ্রামে ফিরে আসাই নয়, বিদেশে থাকতেই নিজের এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। দেশে ফেরার পর সেই কাজগুলোর তদারকি করছেন নিজেই। চিকিৎসা, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে একাধিক প্রকল্প।
নিজের উপার্জনের ২৫–৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের দাবি
ওসমান গণির ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের মানুষের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। এসব কাজে অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থসহায়তা নেননি বলেও জানান তিনি।
লন্ডনে থাকাকালে নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ডা. ওসমান গণি সরদার ফাউন্ডেশন’। তবে ফাউন্ডেশনে পর্যাপ্ত অর্থসহায়তা না পাওয়ায় নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়েই অধিকাংশ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান এই চিকিৎসক।
মনইল-কানুপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য তাঁর অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ মাঠ, পুকুরঘাট, কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন ও পাঠাগার। এ ছাড়া গ্রামের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ডা. ওসমান গণি পলিক্লিনিক। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চালু করেছিলেন শিক্ষাবৃত্তিও।
ওসমান গণির অর্থায়নে নির্মিত মসজিদটি তাঁর বড় প্রকল্পগুলোর একটি। তাঁর ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটির নির্মাণকাজে এ পর্যন্ত প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এখনো এর কাজ চলছে।
নিজের দীর্ঘদিনের উদ্যোগ সম্পর্কে ওসমান গণি জানান, লন্ডনে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময়ও গ্রামের মানুষের কথা তাঁর মনে পড়ত। সেখান থেকেই জন্মভূমির মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। জীবনে অর্জিত সম্পদের একটি অংশ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাই তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
গ্রামের বাইরেও উন্নয়নকাজ
নিজের গ্রাম ছাড়াও আক্কেলপুর পৌরশহরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অর্থায়ন করেছেন ওসমান গণি। তাঁর উদ্যোগে সেখানে নির্মিত হয়েছে আক্কেলপুর আদর্শ ক্লাব ও পাঠাগারের নতুন ভবন।
প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক রাব্বি হায়দার চৌধুরী জানান, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটির পুরোনো ভবন ছিল আধা পাকা। পরে ওসমান গণির অর্থায়নে ‘আদর্শ কমিউনিটি সেন্টার কাম আদর্শ ক্লাব’ নামে নতুন ভবনটি নির্মাণ করা হয়।
এ ছাড়া কানুপুর উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ভবন, পাঠাগার ও হলরুম নির্মাণেও সহায়তা করেছেন তিনি। এসব উদ্যোগ স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সহায়তার পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের বাড়িঘর নির্মাণেও সহযোগিতা করেন ওসমান গণি। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ২০১৩ সালে তিনি শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছিলেন। মাঝখানে কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর কার্যক্রমটি আবার শুরু হয়েছে।
বয়স বেড়েছে, থামেনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা
গ্রামের মানুষের চিকিৎসার সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠিত পলিক্লিনিকে একসময় নিয়মিত রোগী দেখতেন ওসমান গণি। তবে বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো সেখানে বসতে পারেন না। তারপরও কেউ চিকিৎসার পরামর্শ নিতে তাঁর বাড়িতে গেলে যথাসাধ্য সহায়তা করেন। প্রয়োজন হলে ওষুধ কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতাও দেন।
তাঁর ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক নজরুল হায়দার বলেন, লন্ডনে থাকাকালেও বড় ভাই গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে ভাবতেন। সেখান থেকেই উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা করেন। দেশে ফিরে আসার আগেই অনেক উদ্যোগ শুরু করেছিলেন এবং প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিজে তদারকি করেছেন।
আক্কেলপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুজ্জামান কমলও জানান, ওসমান গণি নিজের এলাকার মানুষের জন্য ক্লিনিক, কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন।
মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে লন্ডনের চিকিৎসক
মনইল-কানুপুর গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম ওসমান গণির। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা, লাহোর, প্রাগ ও লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন তিনি। ১৯৫৭ সাল থেকে দেশ-বিদেশে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে বিদেশে কাটানো সময়ের পরও নিজের শৈশবের গ্রাম ও সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রার কথা ভুলতে পারেননি তিনি। শৈশবে গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের সংকট কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের প্রেরণা হয়ে ওঠে।
ওসমান গণি বলেন, ছোটবেলায় গ্রামের মানুষের নানা কষ্ট দেখেছেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও আবাসনের সুযোগ ছিল সীমিত। লন্ডনে কাজ করলেও জন্মভূমির মানুষের কথা তাঁকে ভাবাত। তাই জীবনের বাকি সময় গ্রামের মানুষের সঙ্গে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন। নিজের অর্জনের একটি অংশ মানুষের উপকারে লাগাতে চান তিনি।
নিজের অর্জন মানুষের কাজে লাগাতে চান
ওসমান গণির উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, জন্মভূমির প্রতি টান এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করার আকাঙ্ক্ষা। চিকিৎসা, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামো—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অর্থায়নে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ভূমিকা রাখছে।
৯১ বছর বয়সেও নিজের উদ্যোগগুলোর খোঁজখবর রাখা এবং মানুষের প্রয়োজনে সাধ্যমতো পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন এই প্রবীণ চিকিৎসক। তাঁর দীর্ঘ পথচলা দেখায়, পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি সেই অর্জন সমাজের মানুষের কল্যাণেও কাজে লাগানো যায়।
লন্ডনে থেকে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গ্রামে ফিরে আসা ওসমান গণির কাছে তাই শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি নিজের শিকড়ের কাছে ফিরে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার এক দীর্ঘ অঙ্গীকার।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!