Dark Mode
Image
  • Thursday, 29 January 2026

খাঁটি মধু চেনার নামে প্রচলিত ভুল ধারণা: কী সত্য, কী মিথ্যা?

খাঁটি মধু চেনার নামে প্রচলিত ভুল ধারণা: কী সত্য, কী মিথ্যা?

মধু নিয়ে আমাদের সমাজে নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। আগুনে ধরালে খাঁটি, পানিতে ফেললে ভেজাল—এমন বহু পরীক্ষায় আমরা প্রায়ই বিশ্বাস করি, অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। নিজের চোখে না দেখে এবং বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই না করে কোনো কিছু বিশ্বাস করাই আসলে ঠিক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাঁটি ও ভেজাল মধু চেনার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো ল্যাবরেটরি টেস্ট। এর বাইরে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য আরেকটি তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য উপায় হলো—মধু নিয়ে গবেষণা করেন, বিষয়টি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন এবং সততার সঙ্গে সত্য বলেন—এমন কোনো মধু বিশেষজ্ঞ বা চাষির মতামতের ওপর আস্থা রাখা। এর বাইরে প্রচলিত পরীক্ষাগুলোর কোনোটিই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়।

প্রচলিত কিন্তু ভুল মধু পরীক্ষাগুলো

অনেকেই মধু যাচাইয়ের জন্য যেসব পরীক্ষা করেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

* আগুন পরীক্ষা
* পানি পরীক্ষা
* পিঁপড়া পরীক্ষা
* ফ্রিজিং পরীক্ষা
* চুন পরীক্ষা

বিজ্ঞানসম্মতভাবে এসব পরীক্ষার কোনো ভিত্তি নেই।

খাঁটি মধু বলতে কী বোঝায়?

খাঁটি মধুর কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অনেক সময় ভুলভাবে ভেজালের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হয়। যেমন—

1. মধুর ওপর হালকা ফেনা বা গ্যাস তৈরি হওয়া
2. সময়ের সঙ্গে গাদ বা স্তর জমা
3. তলানিতে চিনির মতো দানা জমা হওয়া (গ্লুকোজ ও সুক্রোজ)
4. কিছু মধু স্বাভাবিকভাবেই পাতলা হওয়া

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বরই ফুল বা সুন্দরবনের মধুতে প্রাকৃতিকভাবে আর্দ্রতা (ময়েশ্চার) বেশি থাকে, ফলে এসব মধু তুলনামূলক পাতলা হয় এবং গ্যাসও বেশি তৈরি হয়।

মধু জমাট বাঁধা কি ভেজালের লক্ষণ?

অনেকের ধারণা, খাঁটি মধু কখনো জমাট বাঁধে না—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মধুর প্রধান উপাদান গ্লুকোজ ও সুক্রোজ। গ্লুকোজ স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে ক্রিস্টালাইজড (জমাট) হতে পারে। মধুতে পানির পরিমাণ কম হলে দ্রুত জমাট বাঁধে, আর বেশি হলে সময় লাগে বা নাও বাঁধতে পারে।

ঘনত্ব বা পানিতে পরীক্ষা কেন ভুল?

মধুর ঘনত্ব ফুলভেদে ও মৌসুমভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই পানিতে ঢেলে, আঙুলের নখে রেখে বা কাগজে ফেলে মধু পরীক্ষা করলে সঠিক ফল পাওয়া যায় না। এসব পরীক্ষার ফল সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

আগুন ধরলে খাঁটি—এই ধারণা কেন ভুল?

মধুতে আগুন ধরলেই খাঁটি—এটি একটি প্রচলিত মিথ। মধুতে যদি মোম মেশানো হয়, তাহলে আগুন ধরবেই। এমনকি চিনির শিরায় মোম মিশিয়েও একই ফল পাওয়া সম্ভব। ফলে আগুন পরীক্ষা কোনোভাবেই খাঁটি মধুর প্রমাণ নয়।

পিঁপড়া কি খাঁটি মধুতে ধরে না?

এ ধারণাটিও ভুল। পিঁপড়া মূলত সুক্রোজ ও গ্লুকোজে আকৃষ্ট হয়। মধুর প্রধান উপাদানই হলো এই দুই উপাদান। তাই পিঁপড়া ধরা বা না ধরা দিয়ে মধুর মান বিচার করা যায় না।

মৌমাছিকে চিনি খাওয়ানো—বাস্তবতা কী?

প্রকৃতিতে মৌমাছিকে চিনি গ্রহণ করতে দেখা যায়—চায়ের দোকান বা মিষ্টির দোকানে মৌমাছির আনাগোনা তারই প্রমাণ। তাই এই বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে সব চাষের মধুই ভেজাল।

সচেতন হওয়াই একমাত্র উপায়

নিজের চোখের সামনে মৌচাক ভেঙে নেওয়া মধুতেও এসব পরীক্ষার ফল ভিন্ন হতে পারে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজেই প্রচলিত পরীক্ষায় ভেজাল মধুকেও ‘খাঁটি’ প্রমাণ করতে পারে। তাই মধু কেনার আগে বিশ্বস্ত চাষি বা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

লিখেছেন: মোঃ আবেদীন কবীর

Comment / Reply From