বই পড়েও মিলতে পারে মানসিক স্বস্তি
বই পড়েও মিলতে পারে মানসিক স্বস্তি, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
মানসিক চাপ, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্নতার মতো সমস্যায় ওষুধ ও কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে একটি ভিন্নধর্মী পদ্ধতি—বিবলিওথেরাপি (Bibliotherapy)। এই পদ্ধতিতে ব্যক্তির মানসিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বই পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক বই নির্বাচন করা গেলে তা মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি কোনোভাবেই চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক একটি উপায়।
কী এই বিবলিওথেরাপি?
বিবলিওথেরাপি হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে গল্প, উপন্যাস, আত্ম-উন্নয়নমূলক (Self-help) কিংবা তথ্যমূলক বইয়ের মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনের কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলার শক্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। বইয়ের চরিত্র, অভিজ্ঞতা ও গল্পের সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেলে অনেকের মানসিক চাপ কমে এবং নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।
বাস্তব অভিজ্ঞতা
যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের শিক্ষিকা ও গ্রন্থাগারিক এলিজাবেথ রাসেল ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময়—বিষণ্নতা, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পারিবারিক চাপ—মোকাবিলার সময় বিবলিওথেরাপির সহায়তা নেন। যুক্তরাজ্যের একজন বিবলিওথেরাপিস্ট তার জন্য কয়েকটি উপন্যাস নির্বাচন করে দেন। তিনি জানান, বইগুলোর চরিত্র ও ঘটনাগুলো তাকে নিজের সংকট বুঝতে, একাকিত্ব কাটাতে এবং মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছে?
বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিবলিওথেরাপির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। শুধু উপন্যাস নয়, আত্ম-উন্নয়নমূলক এবং তথ্যভিত্তিক বইও এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি, কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সহায়ক থেরাপি হিসেবে বইয়ের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সব বই কি উপকারী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ধরনের বই সমানভাবে উপকারী নয়। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যায় ভোগা কিছু মানুষ সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক উপন্যাস পড়ে আরও বেশি মানসিক চাপে পড়েছেন।
যেসব বই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাকে অতিরঞ্জিত বা রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করে, সেগুলো কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বই নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
চিকিৎসার বিকল্প নয়
এনএইচএসের চিকিৎসকদের মতে, বিবলিওথেরাপি মূল চিকিৎসার বিকল্প নয়। এটি ওষুধ, কাউন্সেলিং বা অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে গুরুতর বিষণ্নতা, আত্মহত্যার ঝুঁকি বা জটিল মানসিক রোগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বইয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
লাইব্রেরিতেও দেওয়া হচ্ছে বইয়ের পরামর্শ
যুক্তরাজ্যের অলাভজনক সংস্থা The Reading Agency ২০১৩ সাল থেকে ‘Reading Well’ কর্মসূচির মাধ্যমে বিষণ্নতা, ডিমেনশিয়া ও অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ করা বইয়ের তালিকা প্রকাশ করছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৯ লাখের বেশি বই এই কর্মসূচির আওতায় ধার দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের এক জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ শতাংশ পাঠক জানিয়েছেন, এসব বই তাদের নিজের মানসিক অবস্থা বুঝতে এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছে।
বইয়ের সঙ্গে আবেগের সংযোগ জরুরি
গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু বই পড়াই যথেষ্ট নয়; পাঠকের সঙ্গে বইয়ের আবেগগত সংযোগও গুরুত্বপূর্ণ। গল্পের চরিত্র বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারলে মানসিক স্বস্তি আরও বেশি পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বই পড়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করলে এর ইতিবাচক প্রভাব বাড়ে। তাই বুক ক্লাব বা পাঠচক্রে অংশ নেওয়াও উপকারী হতে পারে।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সবার জন্য একই বই কার্যকর নাও হতে পারে। কোনো বই ভালো লাগলে পড়া চালিয়ে যেতে পারেন, আবার অস্বস্তি তৈরি হলে তা বন্ধ করাও স্বাভাবিক। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বইকে সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!