বৈসাবি: পাহাড়ি সংস্কৃতির রঙিন নববর্ষ উদ্যাপন
চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু—এই সময়টাতে পাহাড়ি অঞ্চলে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি, আচার আর বিশ্বাস মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য উৎসবমালা, যাকে অনেকেই একসঙ্গে ‘বৈসাবি’ নামে চেনে। তবে এটি কোনো একক উৎসব নয়; বরং ত্রিপুরাদের ‘বৈসুক’, মারমাদের ‘সাংগ্রাইন’ এবং চাকমাদের ‘বিজু’—এই তিন উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর মিলেই ‘বৈ-সা-বি’।
🌿 ত্রিপুরাদের বৈসুক
ত্রিপুরা সম্প্রদায় চৈত্রের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিনজুড়ে উদ্যাপন করে ‘বৈসুক’। উৎসবের শুরুতেই তরুণ-তরুণীরা ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করে এবং পশুপাখিকে খাদ্য দেয়। অতিথি আপ্যায়নে থাকে পিঠা ও নানা খাবার। এই সময় ‘গরাইয়া’ নৃত্য বিশেষ আকর্ষণ।
🌸 মারমাদের সাংগ্রাইন
মারমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সাংগ্রাং নামের এক দেবীর আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘সাংগ্রাইন’। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে ফুল সংগ্রহ, বুদ্ধপূজা, প্রার্থনা, প্রদীপ জ্বালানোসহ নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে। জলকেলিও এই উৎসবের অন্যতম আনন্দঘন অংশ।
🌺 চাকমাদের বিজু
চাকমা সম্প্রদায়ের ‘বিজু’ উৎসবও তিন দিনব্যাপী। প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’, দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’ এবং তৃতীয় দিন ‘গুজ্জেই পজ্জা’। ফুল দিয়ে ঘর সাজানো, নদীতে ফুল ভাসানো এবং ‘পাঁচন’ রান্না এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নতুন বছরের জন্য সুখ-সমৃদ্ধির প্রার্থনাও করা হয় এদিন।
🌼 সাঁওতালদের বাহা উৎসব
সমতলের সাঁওতাল জনগোষ্ঠী উদ্যাপন করে ‘বাহা’ বা ফুল উৎসব। শাল ফুলকে ঘিরে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। নাচ-গান, জল ছিটানো এবং ফুল বিতরণের মধ্য দিয়ে উৎসবটি সম্পন্ন হয়।
🌾 ঐতিহ্য আর বিশ্বাসের মিলনমেলা
এ ছাড়া মুণ্ডা ও অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও চৈত্র-বৈশাখে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। পান্তাভাত খাওয়ার মতো সহজ রীতিও রয়েছে, যা নতুন বছরে শরীরকে ঠান্ডা রাখবে—এমন বিশ্বাস থেকে এসেছে।
সব মিলিয়ে, এই সময়ের উৎসবগুলো শুধু আনন্দের নয়; বরং হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। গান, নৃত্য আর আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষ ভুলে যায় সব বিভেদ, মিলিত হয় এক আনন্দময় বন্ধনে।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!