ভিটামিন বেশি খেলেই কি বেশি উপকার?
সুস্থ থাকা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো কিংবা ত্বক ও চুল ভালো রাখার আশায় অনেকেই নিয়মিত ভিটামিন ও বিভিন্ন ধরনের খাদ্য-সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সারদের নানা ধরনের ‘সাপ্লিমেন্ট রুটিন’ দেখে অনেকে প্রয়োজন না থাকলেও এসব পণ্য ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
কিন্তু ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট মানেই যে যত বেশি, তত ভালো—বিষয়টি এমন নয়। শরীরে কোনো নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি না থাকলে নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। বরং কিছু ভিটামিন ও খনিজ অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
একই উপাদান বারবার নেওয়ার ঝুঁকি
একসঙ্গে একাধিক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সহজেই চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। মাল্টিভিটামিনের পাশাপাশি চুল ও নখের জন্য গামি, ইমিউনিটি সাপ্লিমেন্ট কিংবা প্রোটিন পাউডার—প্রতিটি পণ্যে আলাদা আলাদাভাবে একই ভিটামিন বা খনিজ থাকতে পারে।
ফলে ব্যবহারকারী বুঝতে না পেরে একই উপাদান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারেন। পুষ্টিবিদেরা এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ডাবল ডিপিং’ বা ‘ট্রিপল ডিপিং’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সব ভিটামিন শরীরে একইভাবে জমে না
ভিটামিনের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত গ্রহণের প্রভাবও ভিন্ন হতে পারে। ভিটামিন সি ও বি-গ্রুপের মতো পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিনের অতিরিক্ত অংশ সাধারণত প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করলেও এগুলো যে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত, এমন নয়।
অন্যদিকে ভিটামিন এ, ডি, ই ও কে চর্বিতে দ্রবণীয়। এগুলো শরীরে জমা হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন উচ্চমাত্রায় গ্রহণ করলে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত ভিটামিন এ বা ডি গ্রহণের ফলে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজন ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত নয়।
‘প্রাকৃতিক’ বা ‘হারবাল’ মানেই নিরাপদ নয়
অনেক সাপ্লিমেন্ট ‘প্রাকৃতিক’, ‘হারবাল’ বা ‘ন্যাচারাল’ হিসেবে বাজারজাত করা হয়। এসব শব্দ দেখে অনেকেই ধরে নেন পণ্যটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। বাস্তবে কোনো উপাদান প্রাকৃতিক হলেই যে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে না, তা নয়।
কিছু হারবাল বা বোটানিক্যাল সাপ্লিমেন্টের সঙ্গে লিভারের ক্ষতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আবার পণ্যের মান, উপাদানের ঘনত্ব ও দূষণ নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। তাই এমন সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।
নিয়মিত ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া হতে পারে
সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে যারা নিয়মিত প্রেসক্রিপশন ওষুধ খান, তাদের বিশেষভাবে সতর্ক হওয়া দরকার। কিছু ভিটামিন, খনিজ বা হারবাল উপাদান নির্দিষ্ট ওষুধের কার্যকারিতা বাড়াতে বা কমাতে পারে।
বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ওষুধসহ দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের সঙ্গে কিছু সাপ্লিমেন্টের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ গ্রহণ করলে নতুন সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসককে জানানো ভালো।
সাপ্লিমেন্টের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঠিক নয়
সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের কারণে কারও মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি এখন বড়ি থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাস্তবে সাপ্লিমেন্ট কোনোভাবেই অনিয়মিত জীবনযাপন বা পুষ্টিহীন খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সেটি স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।
কারা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন?
সবার জন্য একই ধরনের ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট প্রয়োজন হয় না। কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্টের পরামর্শ দিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায়: গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডসহ নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদানের প্রয়োজন বাড়ে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রিন্যাটাল ভিটামিন গ্রহণ করা হতে পারে।
ভেগান বা কঠোর নিরামিষভোজীদের ক্ষেত্রে: প্রাণিজ খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া ব্যক্তিদের ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির ঝুঁকি থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বি১২ সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যায়।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি, কিছু রোগ, শোষণজনিত সমস্যা কিংবা বিশেষ খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও চিকিৎসক সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন।
নিজের সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারে কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
প্রথমেই নিজের প্রয়োজন বুঝতে হবে। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শ, বিজ্ঞাপন বা পরিচিত কারও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়।
কোনো সাপ্লিমেন্ট দীর্ঘদিন ব্যবহার করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আছে কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।
সাপ্লিমেন্ট কেনার সময় পণ্যের উপাদান, মাত্রা, মেয়াদ ও প্রস্তুতকারকের তথ্য যাচাই করাও জরুরি। সম্ভব হলে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মান যাচাইয়ের সনদ রয়েছে কি না, সেটিও দেখা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একই ধরনের একাধিক সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে নেওয়ার আগে প্রতিটির উপাদান তালিকা মিলিয়ে দেখা। কারণ আলাদা আলাদা পণ্যের মাধ্যমে একই ভিটামিন বা খনিজ অতিরিক্ত গ্রহণ হয়ে যেতে পারে।
ভিটামিন ও সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন থাকলে সঠিক মাত্রায় তা উপকারী হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজন না বুঝে বা অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে উপকারের বদলে ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই ‘বেশি মানেই বেশি উপকার’—এই ধারণা থেকে বের হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাই নিরাপদ।
Comment / Reply From
You May Also Like
Popular Posts
Newsletter
Subscribe to our mailing list to get the new updates!